রাত ২ টা ।
থানার বারান্দায় একটা বাল্ব জ্বলছে-নিভছে। আমি ভেতরে ঢুকলাম। জুতোয় পুকুরপাড়ের কাদা শুকিয়ে আছে, ফোনের স্ক্রিন ফাটা। জলে পড়েছিল।
টেবিলের ওপাশে নারী অফিসার। নেমপ্লেটে লেখা সাবিনা খাতুন।
"বসুন।"
"আমার স্ত্রী নিখোঁজ। তিন দিন হলো। নাম নীলা।"
সাবিনার কলম থেমে গেল। এক সেকেন্ড, হয়তো কম। তারপর আবার চলল।
"ছবি আছে?"
ফোনটা বাড়িয়ে দিলাম। তিনি ছবিটা দেখলেন, কিছু বললেন না। বুড়ো আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর স্থির হয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বললেন, "মুখটা বেশি পরিষ্কার, পেছনটা ঝাপসা। এডিট করা।"
"পুরোনো ছবি। ওটাই আছে।"
"আপনাদের বাড়িতে আমার লোক গিয়েছিল। প্রতিবেশীরা কেউ নীলাকে দেখেনি।"
"ও কম মিশত।" গলা শুকিয়ে গেল। "চার বছর বিয়ে হয়েছে, বাড়ির সামনের পুকুরপাড়ে ছাড়া ও কোথাও বসত না।"
"আপনার আস্তিনে কাদা।"
আমি আস্তিন টেনে নামালাম। "ঘুমোতে পারি না। রাত হলেই পুকুরের পাড়ে বসে বসে পানির শব্দ শুনি। আর একটা গলা।"
"কার গলা?"
"জানি না।" আমি মাথা নাড়লাম। "আপনি কি নিশ্চিত, আমি সেদিন এখানে এসেছিলাম?"
সাবিনা আমার দিকে তাকালেন। "কোন দিন?"
"মানে... আজই তো।"
"আপনি এ প্রশ্ন তৃতীয়বার করলেন।"
আমি করেছি? মনে পড়ছে না।
সাবিনা উঠে জানালার কাছে গেলেন। তাঁর হাত কাঁপছে। "নীলা আমার বান্ধবী ছিল," তিনি পিঠ ফিরিয়ে বললেন। "চার বছর ওর খবর নেই। শুধু একটা বিয়ের খবর পেয়েছিলাম, আর একটা ঠিকানা।"
ঘরটা হঠাৎ ছোট হয়ে এল।
"তিন দিন আগে নীলা আমাকে ফোন করেছিল," তিনি বললেন। "বলেছিল ওর ভয় করছে। আমি ডিউটিতে ছিলাম। বলেছিলাম, কাল যাব।"
আমি কিছু বললাম না।
"আপনি এসেছেন সাক্ষী খুঁজতে, তাই না?" তিনি ফিরলেন। "কেউ একজন, যে বলবে নীলা সত্যিই হারিয়ে গেছে।"
কথাটা আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল। "হ্যাঁ। যে বিশ্বাস করলে আমিও করতে পারতাম।"
সাবিনা ড্রয়ার খুলে একটা ভেজা-দাগ-ধরা ফোন টেবিলে রাখলেন। “পুকুরের পাড় থেকে আজ বিকেলে পাওয়া গেছে। একটা ভিডিও আছে। ছবি অন্ধকার, কিন্তু শব্দ পরিষ্কার।"
তিনি প্লে করলেন। জলের শব্দ। ধস্তাধস্তি। তারপর একটা গলা, চাপা, ভাঙা: "ছাড়ো!"
আমার শরীর হিম হয়ে গেল। এই গলাটাই তো রোজ রাতে শুনি।
"আমি ওর কাঁধে হাত রেখেছিলাম," আমি ফিসফিস করে বললাম। "ও পিছলে গেল। আমি ধরতে পারলাম না। ধাক্কা দিয়েছিলাম কি না, মনে নেই। বিশ্বাস করুন, আমি মনে করতে পারি না।"
"তাহলে আমাকে ফোন করেছিলেন কেন?"
"কারণ ওই গলাটা..." আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। "ওই গলাটা নীলার না। ওটা আপনার।"
সাবিনা নড়লেন না।
"আপনি সেদিন ওখানে ছিলেন ! আপনি আসেননি, বলছেন, কিন্তু আপনি ছিলেন। আমি আপনার গলা চিনি।"
বাইরে বাল্বটা নিভে গেল। অন্ধকারে সাবিনার নিশ্বাস শুনলাম। ধীর। খুব ধীর।
"আপনি কি নিশ্চিত," তিনি বললেন, "ওই গলাটা আমি চিনিয়ে দিইনি আপনাকে, তিন দিন আগে, ফোনে?"
আমি হাসলাম। অন্ধকারে সেটা কেউ দেখল না।
"ফোনে আপনি শুধু একটা কথাই বলেছিলেন," আমি বললাম। "'ছাড়ুন ওকে।' ওইটুকুই আমি রেখে দিয়েছিলাম।"

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন