কোম্পানির কাজের জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহের শেষে রহিম সাহেবকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে যেতে হয় । এই সপ্তাহেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি । ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে কিছুটা পথ পার হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো । ব্যাপারটা যেন না বলে আসা মেহমানের মতো লাগলো রহিম সাহেবের । ছাতাটাও বোধ হয় ট্রেনে ফেলে এসেছেন । এ নিয়ে ছাতা হারানোর সংখ্যা মনে হয় হাফ সেঞ্চুরি পার হবে । কিছুটা সামনে যেতেই একটা বন্ধ চায়ের দোকান চোখে পড়ল । মাথাটাকে কিছুটা হলেও এই বৃষ্টির হাত থেকে বাচাতে পারবেন এই ভেবেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো । টিনের তলায় কিছুক্ষন দাড়াতেই চল্লিশ বছর বয়সী এক লোক এশে পাশে দাড়ালো ।
“কি হে মশাই এই এলাকায় নতুন নাকি”
“জি ভাই কাজের সুবাদে এখানে আসা আরকি”
কেন যে এই কথা বলতে গেলাম এই ভেবে জিভ কাটলাম ।
“ তো কোথায় ঊঠবেন ?’’
“ হাটহাজারী তে একটা হোটেল বুক করেছিলাম এই বৃষ্টির জন্য মনে হচ্ছে যেতে দেরি হয়ে যাবে । আপনি বুঝি এই এলাকার বাসিন্দা?’’ একটু আগ্রহ নিয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করলাম ।
“ আজ্ঞে সেই রকম না , আবার বলতে গেলে বাসিন্দাও । আমি এখানে ৬ মাস হয়েছি এসেছি।”
“ ওহ আচ্ছা । তা এলাকাটা খুব শুনশান । ভয় লাগে না আপনার ?”
“ ভয়ের কথা বললে তো অনেক কথাই চলে আসে । এখানে এসেই আমাকে নিঃস্ব হতে হয়েছে ।”
“ ভয়ের সাথে নিঃস্ব হওয়ার সম্পর্কটা ঠিক বুঝলাম না ভাই।”
“ কি আর বলব , এসব বললে তো সকলে মনে করে আমি নেশা টেশা করে কথা বলছি ।”
“ আপনি কি ৬ মাসের জন্য কোন হন্টেড প্লেসে থাকবেন ?”
“ আমি থাকেতে যাবো কেন ?”
“ সেরকম ঘটনাই আমার সাথে ঘটেছে ভাই । চাকরীর ১২ বছর বয়সে ভালোই অর্থ সঞ্চয় করেছিলাম । নিজের বলতে তখনো কোন ঘরবাড়ি ছিল না । তাই মনে মনে একটা বাংলো কেনার ইচ্ছা জাগে । আমাএ বন্ধু এখানে একটা ঝকঝকে বাংলো খুজে পায় । দামটাও হাতের নাগালে থাকায় আর দেরী করিনি । আর বউকে সারপ্রাইজ দেব বলে তাকেও জানাই নি । যেদিন বাড়িতে ওকে নিয়ে আসবো বলে একটু সাজানো গোছানো করবো বলে বাড়িতে ডুকেছি আমার চোখ তো চড়ক গাছ । আমার বঊ বাসায় হাজির। আমাকে উলটো বলছে কেমন সারপ্রাইজ দিলাম ।”
“উনি কি করে জানলেন প্রশ্ন করেন নি?”
“হ্যা , বলল আমার বন্ধু নাকি জানিয়ে দিয়েছিলো । আমি আর ভাবি নি । এদিকে আমার সমস্যা ছিল বাচ্চা কাচ্চা নিতে পারিনি । এখন একটু নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারব এই ভেবে আর এত কিছু মাথায় ছিল না । আর খেয়াল করলাম ও কেমন যেন পালটে গেছে । আবহাওয়া টা আমার ভালো লাগছিলো না । কারো সাথে মিশতাম না বাইরে বের হতাম না । এক দিন আমি অসুস্থ হয়ে পরে যাই বারান্দায় । চোখ খুলে দেখি হাসপাতালের বেডে। সুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়ে দেখি আমার স্ত্রী নেই ।ওর বাপের বাড়ী গিয়ে দেখি ডিভোর্স পেপার । আমি নাকি ৬ মাস ওর সাথে ছিলাম ই না ।”
এ কথা শুনতেই রহিম সাহেবের অবস্থা যেন ঠান্ডায় জমে যাওয়া তুষার এর মত হয়ে গেল । এদিকে বৃষ্টিও কমে গিয়েছিল ।
“ আচ্ছা আমার দেড়ি হয়ে গিয়েছে আমি আসি ।”
“ জি সাবধানে চলাফেরা করবেন । আর ভয় পাবেন না ।”
………………………………………………………………
৩ মিনিট সামনে হাঁটা দিতেই একটা বাংলো চোখে পড়লো । জানালায় একজন মাঝারি বয়স্ক মহিলা দেখতে পেলেন রহিম সাহেব । ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার উপক্রোম । অপরিচিত লোকটির বলা গাজা খুরে গল্প যেন মস্তিস্কে ঘুরপাক খেতে লাগো।
ঠাস!!
মাথায় যেন কি একটা লাগলো।
চোখ খুলে নিজেকে হসপিটালের বেডে নিজেকে আবিস্কার করলেন । সামনে তার স্ত্রী সন্তান বসা ছিল । তাদের দেখে যেন তিনি প্রান ফিরে পেলেন । সব ঠিকঠাক হওয়ার পড়ে নিজের মানিব্যাগ চেক করে দেখলেন তার ৫৫০০ টাকার মতো গায়েব । আর এটিএম কার্ডের সাথে কোনায় লিখা পিন ও নেই । ছোট্ট একটা চিরকুট খুজে পেলেন যাতে লেখা ছিল -
“ ভয় পেয়েছেন ভাই?”
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন