সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দেয়ালগুলো এখনো কথা বলে


প্রথম খণ্ড: ক্ষুধা ও শৈশব

অধ্যায় ১: ভাতের ভূগোল ও অস্তিত্বের লড়াই

ঢাকা শহরের তপ্ত পিচের ওপর যখন টিসিবির ট্রাকটি এসে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল একটি যান থাকে না; তা হয়ে ওঠে এই রাষ্ট্রে বেঁচে থাকার একমাত্র বাস্তব প্রতীক। জুলাই মাসের দুপুর। সূর্যটা মাথার ঠিক ওপরে। রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে। আরিফ যখন সেই দীর্ঘ লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়াল, তখন সে বুঝতে পারল অর্থনীতির ক্লাসে শেখা 'ডিমান্ড-সাপ্লাই' তত্ত্বটি কতটা নিষ্ঠুর।

লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষ এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না, কারণ ক্ষুধার কোনো আভিজাত্য নেই। সামনে একজন বৃদ্ধ, পেছনে একজন গর্ভবতী নারী। আরিফের হাতে একটি পলিথিনের ব্যাগ আর পকেটে তিনশ টাকা। চালের দাম কেজিতে পঁয়ষট্টি টাকা, কিন্তু টিসিবিতে পঞ্চাশ। এই পনেরো টাকার ব্যবধানটাই আরিফের সপ্তাহের বাজার নির্ধারণ করে দেবে।

লাইনটা এগোচ্ছে ধীরে। প্রতি পাঁচ মিনিটে তিন ফুট। আরিফ হিসাব করল, তার পালা আসতে আরও ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। পাশের চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে টকশোর আওয়াজ। "দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে... রিজার্ভ বাড়ছে... রপ্তানি আয় রেকর্ড..." আরিফ তিক্ত হাসল। এই লাইনে দাঁড়ানোই তার প্রথম রাজনৈতিক পাঠ যেখানে রাষ্ট্র তাকে নাগরিক হিসেবে নয়, বরং একজন 'গ্রহীতা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সামনের বৃদ্ধ হঠাৎ টলতে টলতে পড়ে গেলেন। কয়েকজন তাকে ধরল। জল খাওয়াল। কিন্তু লাইন থেকে সরে গেল না। কারণ এই লাইন থেকে সরে গেলে আবার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। বৃদ্ধ আবার উঠে দাঁড়ালেন। লাইনে ফিরলেন। আরিফ বুঝল, মর্যাদা আসলে এক বিলাসিতা। যখন পেটে খিদে থাকে, তখন মানুষ লজ্জা ভুলে যায়।

ট্রাকের পাশে দাঁড়ানো টিসিবির কর্মচারীটির মুখে এক ধরণের উদাসীনতা। সে চাল মেপে দিচ্ছে যন্ত্রের মতো। তার কাছে এই লাইনের মানুষগুলো সংখ্যা মাত্র। আরিফ লক্ষ্য করল, প্রতিটি মানুষ চাল নিয়ে যাওয়ার সময় মাথা নিচু করে যাচ্ছে। কেউ চোখে চোখ রাখছে না। এই নীরব অপমান প্রতিটি মানুষের শিরদাঁড়া থেকে কিছুটা কেড়ে নিচ্ছে।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো। আরিফের পালা এলো। সে পঞ্চাশ টাকার নোট এগিয়ে দিল। দশ কেজি চাল। ভারী। পলিথিনের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে বাসের দিকে হাঁটা শুরু করল। রাস্তায় বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে লেখা "স্মার্ট বাংলাদেশ"। আরিফ হাসল। স্মার্ট বাংলাদেশে তার এখন দশ কেজি ভাত। এই ভাত দিয়ে মা আর সে মাস চালাবে। প্রতিদিন তিন বেলা নয়, দু'বেলা।

অধ্যায় ২: পিতার প্রস্থান ও মধ্যবিত্তের পতন

আরিফের বাবা আব্দুল করিম ছিলেন একজন আদর্শবাদী স্কুলশিক্ষক। মিরপুরের একটি সরকারি স্কুলে বাংলা পড়াতেন। তেত্রিশ বছরের চাকরি। বেতন পনেরো হাজার টাকা। এই পনেরো হাজার টাকা দিয়ে তিনি বিশ্বাস করতেন সৎভাবে জীবন চালানো যায়। তিনি কোনোদিন প্রাইভেট পড়াননি। বলতেন, "স্কুলে ঠিকমতো পড়ালে প্রাইভেট লাগে না।"

কিন্তু আশেপাশের শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়িয়ে মাসে লাখ টাকা আয় করতেন। তাদের ছেলেমেয়েরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ত। আরিফ পড়ত সরকারি স্কুলে। তার বাবা মনে করতেন, মেধা থাকলে যেকোনো জায়গায় পড়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ক্লাসে ষাটজন ছাত্র, একজন শিক্ষক। বেঞ্চে বসার জায়গা নেই। বই পুরনো। ল্যাবে কোনো যন্ত্র নেই।

আরিফের বাবা যখন বুঝতে পারলেন তার আদর্শবাদ তার ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আরিফ এসএসসিতে জিপিএ ৪.৫ পেল, কিন্তু ভালো কলেজে চান্স পেল না। কারণ ভালো কলেজগুলো চায় জিপিএ ৫। যারা প্রাইভেট পড়ে, কোচিং করে, তারাই জিপিএ ৫ পায়।

তারপর একদিন আব্দুল করিম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রথমে মনে হলো সাধারণ জ্বর। কিন্তু জ্বর সারছে না। ওজন কমে যাচ্ছে। কাশির সাথে রক্ত। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, "ফুসফুসে ক্যান্সার। শেষ পর্যায়।"

আরিফের মা সেদিন মাটিতে বসে পড়েছিলেন। আরিফ তখন কলেজ ফার্স্ট ইয়ার। তার বয়স সতেরো। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। ডাক্তার বললেন, "কেমোথেরাপি লাগবে। খরচ পড়বে লাখ দশেক।"

লাখ দশেক। আব্দুল করিমের সারা জীবনের সঞ্চয় ছিল তিন লাখ টাকা। বাড়িভাড়া, সংসার খরচ বাদ দিয়ে জমানো। তিনি ভেবেছিলেন এই টাকা দিয়ে আরিফের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালাবেন। কিন্তু এখন সেই টাকা যাবে চিকিৎসায়।

সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ক্যান্সার ওয়ার্ড। তিরিশটা বেড। পঞ্চাশজন রোগী। মেঝেতে মানুষ শুয়ে আছে। টয়লেটে লাইন। পানির কল শুকনো। অক্সিজেনের সিলিন্ডার একটা, তাও পুরনো। নার্স নেই। আত্মীয়স্বজনরা রোগী দেখছে। ডাক্তাররা দিনে একবার রাউন্ড দেন। পাঁচ মিনিট।

আব্দুল করিম শুয়ে শুয়ে সিলিং দেখতেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই হাসপাতালে তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার টাকা নেই। একদিন তিনি আরিফকে ডেকে বললেন, "বাবা, আমার চিকিৎসায় আর টাকা খরচ করিস না। এই টাকা তুই পড়াশোনায় লাগা।"

আরিফ কাঁদল। বলল, "বাবা, তুমি সুস্থ হয়ে উঠবা। আমি টাকা জোগাড় করব।"

কিন্তু টাকা জোগাড় করা সহজ নয়। আরিফ চেষ্টা করল বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিতে। কিন্তু কেউ দিল না। আত্মীয়স্বজনরা মুখ ঘুরিয়ে নিল। বন্ধুবান্ধবরা সহানুভূতি দেখাল, কিন্তু টাকা দিল না। আরিফ বুঝল, এই সমাজে কেউ কারো সাথে নেই। প্রতিটি মানুষ নিজের জন্য লড়ছে।

একদিন রাতে আব্দুল করিমের শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। অক্সিজেনের সিলিন্ডার ফাঁকা। নার্স নেই। ডাক্তার নেই। আরিফ দৌড়ে গেল। চিৎকার করল। দশ মিনিট পর একজন নার্স এলো। ততক্ষণে আব্দুল করিম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। আরও পাঁচ মিনিট পর একজন ডাক্তার এলো। তিনি দেখলেন। মাথা নাড়লেন। বললেন, "সরি।"

আব্দুল করিম মারা গেলেন। ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হলো 'কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট'। কিন্তু আরিফ জানত তার বাবা মারা গেছেন চিকিৎসার অভাবে। রাষ্ট্র তাকে হত্যা করেছে। নীরবে। দক্ষভাবে। কোনো বুলেট ছাড়া।

আরিফ সেদিন বুঝল, এই রাষ্ট্রে দরিদ্র হওয়া একটা অপরাধ। তার বাবা সৎ ছিলেন বলে তাকে মরতে হলো। যদি তিনি ঘুষ খেতেন, দুর্নীতি করতেন, তাহলে হয়তো বাঁচতে পারতেন।

অধ্যায় ৩: শূন্য ঘরের অর্থনীতি

বাবার মৃত্যুর পর ঘরটি নিঃশব্দ হয়ে গেল। মা কথা বলা কমিয়ে দিলেন। এই নীরবতা শোকের চেয়েও বেশি ছিল বিচারহীনতার ক্লান্তি। প্রথম কয়েক সপ্তাহ আত্মীয়স্বজনরা এলো। সান্ত্বনা দিল। খাবার নিয়ে এলো। তারপর সবাই চলে গেল। আরিফ আর তার মা দুজন থেকে গেল একটা খালি ফ্ল্যাটে।

ফ্ল্যাটটা ভাড়া। মাসিক ভাড়া আট হাজার টাকা। দুই রুম, একটা বাথরুম, ছোট্ট রান্নাঘর। মিরপুরের একটা পুরনো বিল্ডিংয়ে। লিফট নেই। চতুর্থ তলা। জানালা দিয়ে দেখা যায় একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। সকালে মেয়েরা ঢুকছে, সন্ধ্যায় বের হচ্ছে। ক্লান্ত মুখ। ন্যাতানো চুল।

আরিফের মা সালমা বেগম। বয়স পঁয়তাল্লিশ। গৃহিণী। কোনো চাকরি নেই। কোনো ডিগ্রি নেই। তার সারা জীবন কেটেছে ঘরের কাজে। রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান মানুষ করা। স্বামীর বেতনেই সংসার চলত। এখন স্বামী নেই। বেতন নেই। শুধু আছে একটা অসহায়তা।

আব্দুল করিমের চাকরি থেকে পাওয়া যাবে কিছু টাকা। ভবিষ্য তহবিল, গ্র্যাচুইটি, পেনশন। কিন্তু সেই টাকা পেতে লাগবে মাস ছয়েক। তার আগে বাঁচতে হবে। আরিফ হিসাব করে দেখল, হাতে আছে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে চলতে হবে ছয় মাস।

মাসিক খরচ: বাড়িভাড়া আট হাজার, বিদ্যুৎ-পানি দুই হাজার, খাবার দশ হাজার, যাতায়াত ও অন্যান্য তিন হাজার। মোট তেইশ হাজার। ছয় মাসে লাখ আটত্রিশ। কিন্তু হাতে আছে পঁয়তাল্লিশ হাজার।

আরিফ সিদ্ধান্ত নিল, সে কলেজ ছেড়ে দেবে। টিউশনি খুঁজবে। কিন্তু মা রাজি হলেন না। বললেন, "তোর বাবা চেয়েছিলেন তুই পড়াশোনা শেষ করিস। আমি ভিক্ষা করব, কিন্তু তোর পড়া বন্ধ হতে দেব না।"

আরিফ বুঝল, মায়ের এই জেদ আসলে তার শেষ আশা। তিনি চান তার ছেলে শিক্ষিত হোক। ভালো চাকরি পাক। মধ্যবিত্ত থাকুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এখন বিলাসিতা।

আরিফ আপস করল। সে কলেজ চালিয়ে যাবে, কিন্তু সাথে টিউশনি করবে। সকালে কলেজ, বিকালে টিউশনি। রাতে পড়াশোনা। ঘুম চার ঘণ্টা।

প্রথম টিউশনি জুটল পাশের বাড়িতে। ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে। মাসিক পাঁচশ টাকা। সপ্তাহে তিন দিন, এক ঘণ্টা করে। আরিফ খুশি হলো। কিন্তু পাঁচশ টাকা দিয়ে কী হবে? তার দরকার অন্তত দশ হাজার টাকা মাসে।

সে আরও টিউশনি খুঁজতে লাগল। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করল। কিন্তু সমস্যা হলো, সে এইচএসসি পাস করেনি এখনো। কলেজ স্টুডেন্ট। তাকে কেউ বেশি পয়সা দিতে চাইছে না। অভিজ্ঞতাও নেই। রেফারেন্স নেই।

আরিফ দেখল, মধ্যবিত্তের আভিজাত্য খসে পড়তে কয়েক মাস সময় লাগে না। বাবার আলমারিতে যেসব বই ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, মানিক সেগুলো যখন সে কেজি দরে বিক্রি করতে নিয়ে গেল, তখন দোকানদার বলল, "এসব পুরনো বই এখন কেউ পড়ে না। কেজিতে দশ টাকা দিতে পারব।"

পঁচিশ কেজি বই। দুশ পঞ্চাশ টাকা। এই বইগুলো কিনতে তার বাবার খরচ হয়েছিল হাজার পাঁচেক টাকা। প্রতিটা বইয়ের পাতায় তার বাবার হাতের লেখা নোট। মার্জিনে আন্ডারলাইন। বইগুলোতে তার বাবার গন্ধ।

আরিফ সেদিন প্রথমবার অনুভব করল মেধা এই রাষ্ট্রে সবচাইতে সস্তা পণ্য। জ্ঞান, সংস্কৃতি, চিন্তা এসব কিছুরই কোনো দাম নেই। দাম আছে শুধু টাকার। আর টাকা আসে দুর্নীতি থেকে।

অধ্যায় ৪: টিউশনির ভূগোল

আরিফ ধীরে ধীরে পাঁচটা টিউশনি জোগাড় করল। প্রতিদিন বিকালে সে সাইকেলে করে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যায়। প্রতিটা টিউশনি এক ঘণ্টা। মাসে আয় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এই টাকায় সংসার চলে না, কিন্তু একটু সাহায্য হয়।

প্রথম বাড়ি: গুলশানের একটা ফ্ল্যাট। ক্লাস নাইনের এক মেয়ে। বাবা ব্যবসায়ী। মা গৃহিণী। ড্রয়িংরুমে চামড়ার সোফা। টেলিভিশনে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল। এয়ারকন্ডিশনার। ফ্রিজে আইসক্রিম। মেয়েটা পড়তে চায় না। মোবাইলে টিকটক দেখে। আরিফ যতই বোঝায়, মেয়েটা শোনে না। তার মা বলেন, "স্যার, ওকে কোনোভাবে পাস করিয়ে দিতে পারবেন? আমরা টাকা দেব।"

আরিফ অবাক হয়। শিক্ষা এখানে একটা পণ্য। পাস একটা কেনা জিনিস। মেধার কোনো মূল্য নেই।

দ্বিতীয় বাড়ি: মিরপুরের একটা ছোট্ট ঘর। ক্লাস সিক্সের এক ছেলে। বাবা রিকশাচালক। মা গার্মেন্টসে কাজ করেন। ছেলেটা খুব মেধাবী। পড়তে ভালোবাসে। কিন্তু বই নেই। খাতা নেই। পেন্সিল কিনতে টাকা নেই। আরিফ নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে বই কিনে দেয়। ছেলেটার বাবা বলেন, "স্যার, আমি আপনার ফি দিতে পারছি না ঠিকমতো। কিন্তু দয়া করে আপনি ছাড়বেন না। আমার ছেলেটা পড়বে।"

আরিফের চোখে জল আসে। এই বাবা তার ছেলের জন্য স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু রাষ্ট্র সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেবে না। কারণ ভালো স্কুল, ভালো শিক্ষা সব টাকার ব্যাপার।

তৃতীয় বাড়ি: ধানমন্ডির একটা বাসা। ক্লাস এইটের দুই ভাইবোন। বাবা সরকারি চাকুরে। মা ব্যাংকে চাকরি করেন। মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু এখানে চাপ অন্য রকম। বাবা-মা চান সন্তানরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হোক। ছেলেমেয়েরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়ছে। স্কুল, কোচিং, টিউশনি। তাদের কোনো শৈশব নেই। কোনো খেলা নেই। শুধু পড়া, পড়া, পড়া। আরিফ দেখে, এই শিশুরা আসলে একটা প্রতিযোগিতার শিকার। একটা নিষ্ঠুর রেস, যেখানে জয়ী হতে হবে।

চতুর্থ বাড়ি: মোহাম্মদপুরের একটা মেস। ক্লাস টেনের এক মেয়ে। বাবা নেই। মা একা। ছোট্ট ব্যবসা করেন। মেয়েটা খুব শান্ত। কথা কম বলে। আরিফ লক্ষ্য করে, মেয়েটার চোখে একটা ভয়। সে জিজ্ঞেস করে, "কী হয়েছে?" মেয়েটা প্রথমে কিছু বলে না। তারপর একদিন বলে, "স্যার, আমাদের এলাকার একটা ছেলে আমাকে উত্ত্যক্ত করে। রাস্তায় খারাপ কথা বলে। কী করব বুঝতে পারছি না।" আরিফ রাগ হয়। কিন্তু স্থে কী করবে? পুলিশে যাবে? পুলিশ কি সাহায্য করবে? সমাজ? সমাজ তো মেয়েটাকেই দোষ দেবে।

পঞ্চম বাড়ি: উত্তরার একটা ফ্ল্যাট। ক্লাস সেভেনের এক ছেলে। প্রবাসী বাবা। মা আর ছেলে দেশে। প্রচুর টাকা। কিন্তু কোনো পরিবার নেই। ছেলেটা একা। সারাদিন কাজের লোকের সাথে। মা সারাদিন ফোনে কথা বলেন। সিরিয়াল দেখেন। ছেলেটার সাথে কথা বলেন না। আরিফ দেখে, এই ছেলেটা আসলে এতিম। টাকা আছে, কিন্তু ভালোবাসা নেই।

প্রতিদিন এই পাঁচটা বাড়ি ঘুরে আরিফ বুঝতে পারে, দারিদ্র্য শুধু টাকার অভাব নয়। দারিদ্র্য হলো স্বপ্নহীনতা, ভালোবাসাহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা। প্রতিটা বাড়িতে একটা করে সংকট। কোথাও টাকার অভাব, কোথাও সময়ের অভাব, কোথাও ভালোবাসার অভাব। এবং প্রতিটা সংকটের মূলে আছে একটা ভাঙা রাষ্ট্রব্যবস্থা।




অধ্যায় ৫: কলেজের করিডোর

সরকারি তিতুমীর কলেজ। ঢাকার মহাখালীতে। আরিফ এইচএসসি পড়ছে এখানে। বিজ্ঞান বিভাগ। ক্লাসে আশিজন ছাত্র। একজন শিক্ষক। চকবোর্ড পুরনো। চকের গুঁড়ায় ভরা বাতাস। গরমে হাঁসফাঁস। পাখা চারটা, তিনটা নষ্ট।

শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ান না ঠিকমতো। কারণ তাদের মূল ইনকাম কোচিং সেন্টার থেকে। তারা ক্লাসে এসে বলেন, "যারা ভালো রেজাল্ট চাও, আমার কোচিং সেন্টারে ভর্তি হও।" কোচিং ফি মাসে তিন হাজার টাকা। আরিফের সেই টাকা নেই। সে ক্লাসে বসে শোনে। বাসায় নিজে নিজে পড়ে। লাইব্রেরি থেকে বই ধার করে।

কলেজের লাইব্রেরি। ছোট্ট একটা ঘর। পুরনো বই। ধুলোর স্তর। তবে শান্ত। এখানে কেউ আসে না। আরিফ এখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত। সে স্বপ্ন দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। অর্থনীতি নিয়ে। সে বুঝতে চায়, কেন এই দেশের মানুষ এত দরিদ্র। কেন লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কিনতে হয়। কেন মধ্যবিত্ত ভেঙে পড়ে।

কলেজের রাজনীতি দেখে আরিফ ভয় পায়। সরকার দলীয় ছাত্র নেতারা ক্যাম্পাস চালায়। তারা নির্ধারণ করে কে কী করবে। কে কোথায় বসবে। কে কথা বলবে। একবার আরিফ ক্যান্টিনে বসে বন্ধুর সাথে কথা বলছিল রাজনীতি নিয়ে। বলছিল, "সরকার যদি দুর্নীতি কমাতে পারত, তাহলে হয়তো শিক্ষাখাতে বেশি বাজেট দেওয়া যেত।" একজন ছাত্রনেতা শুনে ফেলল। এসে বলল, "তুই কি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছিস?" আরিফ ভয় পেয়ে গেল। বলল, "না ভাই, আমি শুধু " "শুধু কী? তোর নাম কী?" আরিফ নাম বলল। ছাত্রনেতা বলল, "দেখ, এখানে বেশি বুদ্ধিমান সাজার দরকার নেই। চুপচাপ পড়বে। চুপচাপ পাস করবে। বুঝছিস?"

আরিফ সেদিন বুঝল, এই কলেজে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ। ভাবা নিষিদ্ধ। শুধু মাথা নিচু করে পড়তে হবে।

অধ্যায় ৬: মায়ের নীরব সংগ্রাম

সালমা বেগম চেষ্টা করছেন সংসার চালাতে। কিন্তু টাকা শেষ হয়ে আসছে। স্বামীর চাকরি থেকে যে টাকা পাওয়ার কথা, তা এখনো আসেনি। অফিসে যাচ্ছেন। কাগজপত্র জমা দিচ্ছেন। কিন্তু ফাইল আটকে আছে। কেরানি বলছেন, "আপা, একটু কিছু দিলে কাজ হয়ে যেত।" সালমা বেগম বুঝতে পারছেন, তিনি ঘুষ চাইছেন। কিন্তু তার কাছে ঘুষ দেওয়ার মতো টাকা নেই। এবং তিনি ঘুষ দিতে চান না। তার স্বামী সারা জীবন সৎভাবে চলেছেন। তিনিও চান সেই পথে থাকতে।

কিন্তু সততা খুব ব্যয়বহুল। ফাইল এগোচ্ছে না। টাকা আসছে না। ঘরে খাবার শেষ। চাল শেষ। ডাল শেষ। সালমা বেগম চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছেন। রাতে ঘুম আসে না। তিনি ভাবছেন, কী করবেন। আত্মীয়দের কাছে হাত পাতবেন? কিন্তু তারা তো আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে? লজ্জা লাগে।

একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি কাজ করবেন। কিন্তু কী কাজ করবেন? কোনো শিক্ষা নেই। কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বয়স পঁয়তাল্লিশ। কে তাকে চাকরি দেবে?

তিনি খবরের কাগজ দেখলেন। বিজ্ঞাপন। বেশিরভাগ চাকরিতে চাই তরুণ, শিক্ষিত, অভিজ্ঞ। তিনি কোনোটাই নন। তবে একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেল। "দরকার রান্নার কাজের লোক। মাসিক বেতন তিন হাজার টাকা।" সালমা বেগম ভাবলেন, তিনি তো রান্না পারেন। সারাজীবন রান্না করেছেন।

পরদিন তিনি ঠিকানায় গেলেন। বাড়িটা গুলশানে। বড় ফ্ল্যাট। মালকিন দরজা খুললেন। দেখেই বললেন, "আপনার বয়স তো বেশি। আমার দরকার তরুণ কেউ।" সালমা বেগম বললেন, "আপা, আমি ভালো রান্না পারি। একবার চেষ্টা করে দেখুন।" মালকিন একটু ভাবলেন। বললেন, "আচ্ছা, আজকে একটা খিচুড়ি রান্না করে দেখান।"

সালমা বেগম রান্না করলেন। সুন্দর হলো। মালকিন খেলেন। বললেন, "ভালো হয়েছে। ঠিক আছে, আপনাকে রাখছি।" সালমা বেগম খুশি হলেন। তিনি ফিরে এলেন। আরিফকে বললেন, "আমি একটা কাজ পেয়েছি।" আরিফ জিজ্ঞেস করল, "কী কাজ?" মা বললেন, "রান্নার কাজ।" আরিফ চুপ করে রইল। তার মা কাজের লোক হিসেবে কাজ করবেন। এই লজ্জা সে সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু সে কিছু বলল না। কারণ সে জানে, তাদের বেঁচে থাকার জন্য এই কাজ দরকার।

কিন্তু তিন হাজার টাকায় সংসার চলবে না। আরিফের টিউশনির টাকা মিলিয়ে আট হাজার। তাও কম। একদিন সালমা বেগম আবার পরিচিতদের খোঁজ করলেন। আরেকটা কাজ পেলেন। অন্য একটা বাড়িতে। এবারে ঝাড়ু-মোছা। মাসিক দুই হাজার। মোট পাঁচ হাজার। আরিফের আট মিলিয়ে তেরো হাজার। তাও কম, কিন্তু কোনোরকমে চলবে।

সালমা বেগম এখন সকালে এক বাড়ি, দুপুরে আরেক বাড়ি। সন্ধ্যায় ফিরেন ক্লান্ত। পা ফুলে যায়। হাত দিয়ে গন্ধ আসে। কিন্তু তিনি নালিশ করেন না। আরিফ দেখে মায়ের এই নীরব সংগ্রাম। তার ভেতরে রাগ জমে। রাগ এই রাষ্ট্রের ওপর, যে রাষ্ট্র একজন শিক্ষিত মানুষকে মরতে দিল আর তার স্ত্রীকে ঠেলে দিল দাসত্বে।

অধ্যায় ৭: ক্ষুধার স্মৃতি

একদিন মা রান্নাঘরে খাবার বানাচ্ছেন। আরিফ দেখল, মা নিজে খাচ্ছেন না। শুধু তার জন্য রান্না করছেন। আরিফ জিজ্ঞেস করল, "মা, তুমি খাবে না?" মা বললেন, "আমার খিদে নেই।" কিন্তু আরিফ জানে, মায়ের খিদে আছে। মা শুধু সাশ্রয় করছেন। যাতে তার খাবার ঠিকমতো হয়।

আরিফ কাঁদতে কাঁদতে খেল। প্রতিটা গ্রাস যেন গলায় আটকে যাচ্ছে। সে বুঝল, ক্ষুধা শুধু পেটের ব্যথা নয়। ক্ষুধা হলো একটা সামাজিক অপমান। যখন একজন মা তার সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য নিজে না খেয়ে থাকেন, তখন সেটা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। সেটা একটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

সেই রাতে আরিফ স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নে দেখল, সে একটা বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। লাইনের শেষ নেই। সামনে একটা ট্রাক। ট্রাক থেকে ভাত বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু যতই সে সামনে এগোচ্ছে, ততই ট্রাক দূরে সরে যাচ্ছে। সে দৌড়াচ্ছে, কিন্তু পৌঁছাতে পারছে না। হঠাৎ সে পড়ে গেল। উঠতে পারছে না। চারপাশের মানুষ তাকে মাড়িয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করছে, কিন্তু কেউ শুনছে না।

সে ঘুম থেকে উঠল ঘেমে। বুঝল, এটা স্বপ্ন নয়, এটা তার বাস্তবতা। এই রাষ্ট্রে বেঁচে থাকা একটা দৌড়। এবং যারা দুর্বল, তারা পিছিয়ে পড়ে।

অধ্যায় ৮: এইচএসসি পরীক্ষা

দুই বছর কেটে গেল। আরিফ এইচএসসি পরীক্ষা দিল। সে জানে, তার ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে তার ভবিষ্যৎ। তাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। তাহলে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে। স্কলারশিপ পাবে। জীবন বদলাবে।

পরীক্ষাগুলো ভালো হলো। সে কঠোর পরিশ্রম করেছে। প্রতিদিন মধ্যরাত পর্যন্ত পড়েছে। টিউশনি, সংসার সব সামলিয়ে পড়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা। ফলাফলের অপেক্ষা।

ফলাফল বের হলো। আরিফ জিপিএ ৪.৮৩ পেল। দারুণ। সে খুশি হলো। মা কাঁদলেন। বললেন, "তোর বাবা বেঁচে থাকলে কত খুশি হতেন।" আরিফ জানে, এই রেজাল্ট দিয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে।

সে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিল। কোচিং করার টাকা নেই। সে নিজে নিজে পড়ল। প্রশ্নব্যাংক কিনল। অতীতের প্রশ্ন সলভ করল। ভর্তি পরীক্ষা দিল। পরীক্ষা ভালো হলো।

ফলাফল বের হলো। আরিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে চান্স পেল। সে আনন্দে ডগমগ করছে। কিন্তু সাথে সাথে একটা চিন্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ কীভাবে চালাবে? হলে সিট পাবে কি? না পেলে ব্যাচেলর থাকতে হবে। ভাড়া দিতে হবে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ। বই-খাতার খরচ।

মা বললেন, "চিন্তা করিস না। যেভাবে হোক, আমরা চালিয়ে নেব।" আরিফ জানে, মায়ের সাহস তার শেষ সম্বল।

অধ্যায় ৯: শৈশবের শেষ দিন

ভর্তি হওয়ার আগে আরিফ একদিন গ্রামে গেল। তাদের আসল বাড়ি। মানিকগঞ্জে। বাবার মৃত্যুর পর সে আর যায়নি। আজ গেল। গ্রামের বাড়িটা ছোট্ট। দুটো ঘর। টিনের চাল। মাটির উঠান। সামনে পুকুর। পেছনে বাঁশঝাড়।

গ্রামটা নিস্তব্ধ। মানুষ কম। বেশিরভাগ ঢাকায় চলে গেছে কাজ করতে। যারা আছে, তারা বুড়ো। কিংবা শিশু। তরুণরা নেই। আরিফ পুকুরের পাড়ে বসল। স্মৃতিচারণ করল। ছোটবেলায় এই পুকুরে সে সাঁতার কাটত। বাবার সাথে মাছ ধরত। মায়ের রান্না করা ইলিশ মাছ খেত। সেই দিনগুলো কত সুন্দর ছিল।

এখন সব বদলে গেছে। গ্রাম বদলেছে। মানুষ বদলেছে। আরিফ বদলেছে। আর সেই নিশ্চিন্ত শৈশব ফিরবে না।

সে উঠে দাঁড়াল। ঢাকা ফিরল। তার সামনে এখন এক নতুন যাত্রা। বিশ্ববিদ্যালয়। স্বপ্ন। কিন্তু সাথে সাথে চ্যালেঞ্জ। তাকে টিকে থাকতে হবে। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। বাবার সততার উত্তরাধিকার রক্ষা করতে হবে।

অধ্যায় ১০: মধ্যবিত্তের ময়নাতদন্ত

আরিফ বুঝতে শিখেছে, ক্ষুধা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অবস্থা। যখন একটি দেশের বাজেটের বেশিরভাগ খরচ হয় দুর্নীতিতে, যখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকে সবচেয়ে কম, যখন ধনীরা ধনী হতে থাকে আর গরীবরা গরীব তখন মধ্যবিত্ত পিষ্ট হয়। মধ্যবিত্ত হলো সেই শ্রেণী, যারা গরীব নয়, কিন্তু ধনীও নয়। তারা স্বপ্ন দেখে, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না।

আরিফের বাবা মধ্যবিত্ত ছিলেন। সৎ ছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাকে পিষে মারল। রাষ্ট্র বলল, "তুমি সৎ? তাহলে তুমি বোকা। তোমার কোনো দাম নেই।"

আরিফ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বোকা হবে না। সে সৎ থাকবে, কিন্তু নীরব থাকবে না। সে প্রশ্ন করবে। খুঁজবে উত্তর। এবং একদিন, হয়তো একদিন, সে এই অবস্থার পরিবর্তন আনবে।

দ্বিতীয় খণ্ড: শিক্ষা ও প্রশ্ন

অধ্যায় ১১: বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে বিষণ্ণতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কার্জন হল, টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন এসব জায়গার নাম আরিফ শুনেছে। স্বপ্ন দেখেছে। এখন সে এই ক্যাম্পাসের ছাত্র। অর্থনীতি বিভাগ। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকল আরিফ। বড় একটা হল। সিট ভরে যাচ্ছে। আরিফ এক কোণে বসল। শিক্ষক এলেন। বললেন, "অর্থনীতি পড়ার মানে হলো, তোমরা দেশের উন্নয়ন বুঝবে। জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতি এসব বিষয়ে পড়বে।"

শিক্ষক বোর্ডে লিখতে লাগলেন নানা ফর্মুলা। আরিফ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। কিন্তু তার মনে প্রশ্ন জাগছিল। জিডিপি বাড়লে কি তার মায়ের জীবন বদলাবে? মূল্যস্ফীতি কমলে কি তাদের চালের দাম কমবে? এই তত্ত্বগুলো কি বাস্তবে কাজ করে?

ক্লাস শেষে আরিফ টিএসসিতে গেল। বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে। কেউ বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। কেউ বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আরিফ বসে শুনছিল। তার স্বপ্ন আলাদা। সে বুঝতে চায়, কেন এই দেশের অর্থনীতি শুধু কাগজে-কলমে উন্নত, কিন্তু মানুষের জীবনে দুর্দশা।

সন্ধ্যায় আরিফ হলে ফিরল। সে ফজলুল হক হলে সিট পেয়েছে। ছোট্ট একটা রুম, চারজনের জন্য। দুটো ডাবল ডেকার বেড। এক কোণে টেবিল। পাশে টয়লেট, সবাই শেয়ার করে। হলের খাবার খারাপ। কিন্তু আরিফ অভ্যস্ত। সে টিউশনি করে, যেটুকু আয় হয় তা দিয়ে চলে।

রাতে শুয়ে আরিফ ভাবল, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সে যেমন ভেবেছিল, তেমন নয়। এখানেও আছে শ্রেণীবিভাজন। যাদের টাকা আছে, তারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। যাদের নেই, তারা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু পাবলিক ইউনিভার্সিটিতেও আছে বিভাজন। যারা হল থাকে, তাদের খরচ কম। যারা ব্যাচেলর, তাদের খরচ বেশি। আবার হলের মধ্যেও আছে রাজনীতি। কোন রুম পাবে, কার সাথে থাকবে সব নির্ভর করে তুমি কোন দলের।

আরিফ কোনো দলে যোগ দেয়নি। সে চুপচাপ পড়াশোনা করে। টিউশনি করে। মায়ের জন্য টাকা পাঠায়। পাঠায়।

অধ্যায় ১২: মেহজাবিন ও এক নিঃশব্দ কণ্ঠস্বর

এক সেমিনারে আরিফ গিয়েছিল। বিষয় ছিল "বাংলাদেশের উন্নয়ন: সাফল্য ও সম্ভাবনা।" প্যানেলে ছিলেন তিনজন অধ্যাপক। তারা স্লাইড দেখিয়ে দেখিয়ে বোঝাচ্ছিলেন, কীভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭%, রপ্তানি আয় বাড়ছে, দারিদ্র্য কমছে। সব পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করছিলেন যে দেশ উন্নতির দিকে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে সবাই হাততালি দিচ্ছিল। প্রশংসা করছিল। তখন পেছনের সারি থেকে এক মেয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, "স্যার, আপনারা বলছেন দারিদ্র্য কমছে। কিন্তু আমি যখন ক্যাম্পাসের বাইরে বের হই, দেখি টিসিবির লাইন আগের চেয়ে লম্বা। মানুষের নীরবতাকে কি উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হচ্ছে?"

হলরুমে একটা নীরবতা নেমে এলো। অধ্যাপক একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। বললেন, "দেখো, পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দারিদ্র্য কমেছে।" মেয়েটি আবার বলল, "স্যার, পরিসংখ্যান যারা তৈরি করে, তাদের কি মাঠে যাওয়ার সুযোগ হয়? নাকি ডেস্কে বসে হিসাব করে?"

অধ্যাপক কোনো উত্তর দিলেন না। বিষয় পরিবর্তন করলেন। সেমিনার শেষ হলো।

আরিফ বের হতে হতে সেই মেয়েটিকে খুঁজল। দেখল, সে বইপত্র গুছাচ্ছে। আরিফ কাছে গেল। বলল, "তোমার প্রশ্নটা চমৎকার ছিল।" মেয়েটি তাকাল। হাসল। বলল, "ধন্যবাদ। কিন্তু উত্তর পেলাম না।" আরিফ বলল, "আমি আরিফ। অর্থনীতি বিভাগ।" মেয়েটি বলল, "আমি মেহজাবিন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।"

তারা টিএসসিতে গেল। চা খেতে খেতে কথা বলল। মেহজাবিন বলল, "আমার মনে হয়, এই দেশে উন্নয়ন একটা বর্ণিল কথা। বাস্তবে মানুষের জীবন বদলায় না।" আরিফ বলল, "আমিও তাই মনে করি। আমি নিজে দেখেছি, কীভাবে মধ্যবিত্ত ভেঙে পড়ে।"

আরিফ তার গল্প বলল। বাবার মৃত্যু, মায়ের সংগ্রাম, টিউশনি, দারিদ্র্য। মেহজাবিন মনোযোগ দিয়ে শুনল। বলল, "আমারও গল্প প্রায় একই। আমার বাবা ছোট ব্যবসা করতেন। টেন্ডার নিয়ে দুর্নীতি না করায় ব্যবসা উঠে গেল। এখন আমরা কোনোরকমে চলছি।"

তারা বুঝল, তাদের দুজনেরই অভিজ্ঞতা একই সূত্রে গাঁথা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সততা পরাজিত হয় আর দুর্নীতি জয়ী হয়।

অধ্যায় ১৩: প্রশ্ন করার অধিকার

মেহজাবিনের সাথে আরিফের বন্ধুত্ব গভীর হলো। তারা প্রায় প্রতিদিন দেখা করে। টিএসসিতে বসে আড্ডা দেয়। কথা বলে দেশ, রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে। মেহজাবিন খুব মেধাবী। সে বিভিন্ন বই পড়ে। রাষ্ট্র নিয়ে, ক্ষমতা নিয়ে, মানুষের অধিকার নিয়ে। সে আরিফকে বই দেয়। বলে, "এগুলো পড়। বুঝবে, কীভাবে রাষ্ট্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।"

আরিফ পড়ে। মিশেল ফুকো, চমস্কি, এডওয়ার্ড সাঈদ, গ্রামসি। এইসব চিন্তাবিদদের লেখা পড়ে আরিফ বুঝতে পারে, ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে। কীভাবে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করে। কীভাবে মিডিয়া, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব ব্যবহার করা হয় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে।

মেহজাবিন একদিন বলল, "আরিফ, এই দেশে মানুষ কেন কথা বলে না জানো? কারণ কথা বললে ভাতের থালাটা আরও দূরে সরে যায়।" আরিফ সায় দিল। বলল, "হ্যাঁ। আমার মা যখন অফিসে গিয়ে ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছিলেন, তখন তার ফাইল আটকে গিয়েছিল। শেষে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে।"

মেহজাবিন বলল, "এটাই সমস্যা। রাষ্ট্র মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলে দেয় যে, মানুষ বাধ্য হয়ে ভুল কাজ করে। তারপর রাষ্ট্র বলে, দেখো, মানুষই খারাপ।"

তারা সিদ্ধান্ত নিল, তারা এই নীরবতা ভাঙবে। কিন্তু কীভাবে? বিপ্লব? মিছিল? ধর্মঘট? না, এসব এই দেশে কাজ করে না। রাষ্ট্র শক্তিশালী। পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী সব তার পক্ষে।

মেহজাবিন বলল, "আমরা ছোট ছোট কাজ করতে পারি। মানুষকে সচেতন করা। প্রশ্ন করতে শেখানো।" আরিফ বলল, "কীভাবে?" মেহজাবিন বলল, "দেয়ালে লেখা। পোস্টার। লিফলেট।"

তারা শুরু করল। প্রথমে ছোট ছোট প্রশ্ন। "আপনার ভোটের দাম কত?" "শিক্ষায় বাজেট কেন কম?" "দুর্নীতির টাকা কোথায় যায়?" এইসব প্রশ্ন লিখে তারা বিভিন্ন দেয়ালে লাগাতে লাগল। রাতের বেলা। নীরবে।

প্রথম দিকে কেউ খেয়াল করল না। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ লক্ষ্য করল। কেউ কেউ থামল, পড়ল, ভাবল। কেউ কেউ ছবি তুলল, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করল। ধীরে ধীরে এটা ছড়িয়ে গেল।

অধ্যায় ১৪: ক্যাম্পাস রাজনীতির সুবিধাবাদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস রাজনীতি আরিফের কাছে একটা জটিল জগৎ। সে দেখল, এখানে মেধার কোনো মূল্য নেই। মূল্য আছে শক্তির, দলের, যোগাযোগের। যারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য, তারাই সব সুবিধা পায়। হলের ভালো সিট, স্কলারশিপ, চাকরির সুপারিশ।

ফজলুল হক হলে যখন আরিফ প্রথম এসেছিল, তখন হলের সিট পেতে তাকে এক ছাত্রনেতার কাছে যেতে হয়েছিল। ছাত্রনেতা জিজ্ঞেস করেছিল, "তুই কোন দলে?" আরিফ বলেছিল, "আমি কোনো দলে নেই।" ছাত্রনেতা হাসল। বলল, "তাইলে তোর জীবন কঠিন হবে। তবে আপাতত একটা সিট দিচ্ছি। দেখ, পরে কী করিস।"

আরিফ বুঝল, এটা একটা ফাঁদ। তারা চায় সবাই তাদের দলে যোগ দিক। তারপর তাদের ব্যবহার করবে।

হলের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হয়। রাতে মারামারি। কেউ কেউ আহত হয়। কিন্তু পুলিশ আসে না। কারণ এটা "অভ্যন্তরীণ" ব্যাপার। প্রশাসন চোখ বন্ধ রাখে।

একদিন আরিফের রুমমেট, শামীম, মারা খেয়ে এলো। রাতে। তার মুখ ফুলে গেছে। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। আরিফ জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে?" শামীম বলল, "আমি একটা মিছিলে যাইনি। তাই ওরা মারল।" আরিফ রাগে অস্থির হয়ে গেল। বলল, "পুলিশে যাও।" শামীম বলল, "কোন লাভ নেই। পুলিশ তাদের হাতের মুঠোয়।"

আরিফ বুঝল, এই ক্যাম্পাস একটা ছোট রাষ্ট্র। এখানে নিয়ম-কানুন নেই। আছে শক্তির খেলা। যার লাঠি, তার মহিষ।

অধ্যায় ১৫: মেহজাবিনের সাহস

মেহজাবিন আরিফের চেয়ে বেশি সাহসী। সে খোলাখুলি কথা বলে। ক্লাসে, সেমিনারে, আড্ডায়। সে দেখেছে অনেক কিছু। তার নিজের ক্যাম্পাসেও রাজনীতির দৌরাত্ম্য। কিন্তু সে মাথা নত করেনি।

একদিন সে একটা নিবন্ধ লিখল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে। কীভাবে এটা মেধার মৃত্যু ঘটাচ্ছে। কীভাবে এটা সাধারণ ছাত্রদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। সে এই নিবন্ধ একটা পত্রিকায় পাঠাল। পত্রিকা ছাপল।

নিবন্ধ ছাপা হওয়ার পরদিন মেহজাবিন ক্যাম্পাসে এলো। দেখল, কয়েকজন ছাত্রনেতা তার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা তাকে ঘিরে ধরল। বলল, "তুই কী লিখেছিস?" মেহজাবিন নির্ভীক। বলল, "সত্যি লিখেছি।" একজন ছাত্রনেতা বলল, "সত্যি? তুই বুঝিস সত্যি কী? তোর সাহস কত, তুই আমাদের বিরুদ্ধে লিখবি?"

মেহজাবিন বলল, "আমি কারো বিরুদ্ধে লিখিনি। আমি একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে লিখেছি।" ছাত্রনেতা বলল, "দেখ, এরকম আর করিস না। নইলে তোর জন্য ভালো হবে না।"

মেহজাবিন ভয় পেল না। কিন্তু সে সাবধান হলো। আরিফকে বলল, "আরিফ, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তারা আমাদের ওপর নজর রাখছে।"

অধ্যায় ১৬: দেয়াল লিখনের সূত্রপাত

আরিফ আর মেহজাবিন ঠিক করল, তারা সরাসরি প্রতিরোধ করবে না। বরং নীরবে কাজ করবে। রাতে। যখন কেউ দেখে না। তারা দেয়ালে লেখা শুরু করল। মার্কার পেন দিয়ে। ছোট ছোট প্রশ্ন।

"আপনার নীরবতা কি আপনার সম্মান?" "৭০% বাজেট কোথায় যায়?" "শিক্ষা কি পণ্য?" "স্বাস্থ্যসেবা কেন সবার অধিকার নয়?"

এইসব প্রশ্ন তারা লিখে দিয়ে আসত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে, মেট্রোরেলের পিলারে, বাসস্ট্যান্ডের বোর্ডে। রাতের অন্ধকারে তারা দুজন মিলে কাজ করত।

প্রথমে মানুষ খেয়াল করল না। কিন্তু যখন একই ধরণের প্রশ্ন বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেল, তখন মানুষ কৌতূহলী হলো। কেউ কেউ ছবি তুলল। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করল। #WallQuestions নামে একটা হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে গেল।

মিডিয়া খবর করল। "ঢাকায় রহস্যময় দেয়াল লেখক।" "কে এই প্রশ্নকর্তা?" "নতুন ধরণের প্রতিবাদ?"

কিন্তু আরিফ আর মেহজাবিন চুপ থাকল। তারা কাউকে বলল না। তাদের পরিচয় গোপন রাখল। কারণ তারা জানত, পরিচয় প্রকাশ হলে তাদের ওপর আক্রমণ আসবে।

অধ্যায় ১৭: প্রেমের অঙ্কুর

আরিফ আর মেহজাবিনের মধ্যে ধীরে ধীরে একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল। তারা একসাথে সময় কাটায়। ক্লাসের পর টিএসসিতে বসে। বই নিয়ে আলোচনা করে। দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলে। ধীরে ধীরে এই বুদ্ধিবৃত্তিক সহযাত্রা একটা আবেগজড়িত সম্পর্কে পরিণত হলো।

একদিন বিকালে তারা রমনা পার্কে বসেছিল। চারপাশে সবুজ। পাখির ডাক। মেহজাবিন বলল, "আরিফ, তুমি কি কখনো ভাবো, আমরা যা করছি, তার কোনো মানে আছে? আমরা কি আসলেই কিছু বদলাতে পারব?" আরিফ বলল, "জানি না। কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে।"

মেহজাবিন তাকাল আরিফের দিকে। বলল, "তুমি অনেক সাহসী। তোমার মতো মানুষ এই দেশে কম।" আরিফ লজ্জা পেল। বলল, "আমি সাহসী না। আমি শুধু... আমি শুধু বাঁচতে চাই মাথা উঁচু করে।"

মেহজাবিন মৃদু হাসল। বলল, "এটাই তো সাহস।"

সেদিন সন্ধ্যায় যখন তারা ফিরছিল, আরিফ অনুভব করল, সে মেহজাবিনকে ভালোবাসে। কিন্তু সে কীভাবে বলবে? এই দেশে, এই সময়ে, ভালোবাসা একটা বিলাসিতা। তাদের কাছে সময় নেই প্রেমের জন্য। তাদের কাছে আছে একটা লক্ষ্য। একটা স্বপ্ন।

কিন্তু প্রেম তো আর জিজ্ঞেস করে আসে না।

অধ্যায় ১৮: অভিজাত্যের মুখোশ

অর্থনীতি বিভাগে একটা সেমিনার হলো। বিষয়: "ট্রিকল-ডাউন ইকোনমিক্স: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।" প্যানেলে ছিলেন একজন সচিব, একজন ব্যাংকার, আর একজন অর্থনীতিবিদ। তারা ব্যাখ্যা করছিলেন, কীভাবে ধনীদের আরও ধনী করলে সেই সম্পদ নিচে "ঝরে পড়বে" এবং গরীবরাও উপকৃত হবে।

আরিফ বসে শুনছিল। তার মনে প্রশ্ন জাগছিল। এই থিওরি কি আসলেই কাজ করে? গত পঞ্চাশ বছরে তো ধনী আরও ধনী হয়েছে, কিন্তু গরীব তো গরীবই রয়ে গেছে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে আরিফ হাত তুলল। মাইক্রোফোন পেয়ে বলল, "স্যার, এই ট্রিকল-ডাউন থিওরি যদি কাজ করে, তাহলে কেন আমরা দেখছি টিসিবির লাইন দিন দিন লম্বা হচ্ছে? কেন মানুষ ভর্তুকি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারছে না?"

প্যানেলে বসা অর্থনীতিবিদ একটু অসহজ হলেন। বললেন, "দেখো, অর্থনীতি জটিল। শুধু একটা দিক দেখে বিচার করা যায় না।" আরিফ বলল, "কিন্তু স্যার, মানুষের জীবনে যদি কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে এই তত্ত্বের মানে কী?"

সচিব সাহেব বিরক্ত হলেন। বললেন, "তুমি বুঝো না অর্থনীতি। তোমার প্রশ্ন অপরিপক্ব।"

আরিফ চুপ করল। বুঝল, এখানে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ। বিশেষত যখন সেই প্রশ্ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যায়।

অধ্যায় ১৯: রাষ্ট্রযন্ত্রের নজর

আরিফ আর মেহজাবিনের দেয়াল লেখা এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষ অপেক্ষা করে, নতুন কী লেখা হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। কিছু মানুষ সমর্থন করছে, কিছু মানুষ বিরোধিতা করছে।

কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রও খেয়াল করেছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। কে এই লেখক? তারা CCTV ফুটেজ দেখছে। সাইবার সেল কাজ করছে। কারণ এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর।

একদিন আরিফের হলে একজন প্লেইনক্লথ পুলিশ এলো। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। বলল, "তুমি দেয়ালে লেখালেখি করো?" আরিফ বলল, "না।" পুলিশ বলল, "আমরা জানি, এই ক্যাম্পাসের কিছু ছাত্র জড়িত। তুমি কি কাউকে চেনো?" আরিফ বলল, "না, আমি কিছু জানি না।"

পুলিশ গেল। কিন্তু আরিফ বুঝল, বিপদ ঘনিয়ে আসছে। সে মেহজাবিনকে ফোন করল। বলল, "আমাদের সাবধান হতে হবে। পুলিশ তদন্ত করছে।" মেহজাবিন বলল, "আমি জানি। আমার কাছেও একজন এসেছিল। আমরা এখন কিছুদিন বন্ধ রাখি এই কাজ।"

তারা কাজ বন্ধ করল। কিন্তু তাদের লেখা প্রশ্নগুলো রয়ে গেল। দেয়ালে। মানুষের মনে।

অধ্যায় ২০: প্রেমের উচ্চারণ

একদিন রাতে মেহজাবিন আরিফকে ফোন করল। বলল, "আরিফ, তুমি কি এখন আসতে পারবে? টিএসসিতে?" আরিফ বলল, "এত রাতে? কী হয়েছে?" মেহজাবিন বলল, "আসো। প্লিজ।"

আরিফ গেল। দেখল, মেহজাবিন একা বসে আছে। টিএসসি তখন প্রায় ফাঁকা। দূরে কয়েকজন ছাত্র আড্ডা দিচ্ছে। আরিফ কাছে গেল। বলল, "কী হয়েছে?" মেহজাবিন বলল, "আমার বাবা অসুস্থ। হঠাৎ হ

ার্ট অ্যাটাক হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি আছেন।"

আরিফ মেহজাবিনের হাত ধরল। বলল, "চলো, হাসপাতালে যাই।"

মেহজাবিন মাথা নাড়ল। বলল, "না। মা আছে ওখানে। আমি একটু পরে যাব। আরিফ, আমি ভয় পাচ্ছি। আমি যদি বাবাকে হারাই..."

আরিফ বুঝতে পারল, মেহজাবিন ভেঙে পড়ছে। সে তাকে কাছে টেনে নিল। বলল, "সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবা সুস্থ হয়ে উঠবেন।"

মেহজাবিন কাঁদতে লাগল। আরিফের কাঁধে মাথা রেখে। কিছুক্ষণ পর শান্ত হলো। বলল, "আরিফ, তুমি জানো, তুমি আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গেছো?"

আরিফ তাকাল মেহজাবিনের দিকে। তার চোখে জল। বলল, "তুমিও আমার।"

মেহজাবিন বলল, "আমি জানি, এটা ভালোবাসা। কিন্তু আমি বলতে ভয় পাই। কারণ আমাদের সামনে এত অনিশ্চয়তা।"

আরিফ বলল, "মেহজাবিন, আমিও তোমাকে ভালোবাসি। অনেকদিন থেকে। কিন্তু আমি বলতে পারিনি, কারণ আমার কিছু দেওয়ার নেই। আমি একজন গরীব ছাত্র। আমার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।"

মেহজাবিন হাসল। চোখ মুছল। বলল, "ভালোবাসার জন্য টাকা লাগে না। লাগে সততা। সাহস। স্বপ্ন। এবং সেটা তোমার আছে।"

সেই রাতে তারা দুজন একসাথে বসে রইল। কথা বলল না। শুধু নীরবতায় একে অপরের উপস্থিতি উপভোগ করল। এই নীরব মুহূর্তটাই ছিল তাদের প্রেমের প্রথম প্রকৃত উচ্চারণ।


তৃতীয় খণ্ড: প্রেম ও প্রতিবাদ

অধ্যায় ২১: রাতের দেয়াল ও মার্কার পেন

মেহজাবিনের বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেন। ধীরে ধীরে। এক মাস হাসপাতালে ছিলেন। খরচ হলো লাখ তিনেক। মেহজাবিনের পরিবার ভেঙে পড়ল। তারা ঋণ নিল। বাড়ির কিছু জিনিস বিক্রি করল। কোনোরকমে টাকা জোগাড় করল।

এই ঘটনার পর মেহজাবিন আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো। সে বলল আরিফকে, "আরিফ, আমরা আবার শুরু করব। দেয়ালে লেখা। আমরা থামতে পারি না।"

আরিফ বলল, "কিন্তু পুলিশ "

মেহজাবিন বলল, "পুলিশকে ভয় পেলে তো কিছুই করা যাবে না। আমার বাবা হাসপাতালে পড়ে ছিলেন। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল। কিন্তু এই দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর গাড়ি তিন কোটি টাকার। এই অবিচার নিয়ে আমি নীরব থাকতে পারব না।"

আরিফ মাথা নাড়ল। তারা আবার শুরু করল।

এবার তাদের লেখা আরও তীক্ষ্ণ।

"মন্ত্রীর গাড়ি ৩ কোটি, হাসপাতালে অক্সিজেন নেই এটা উন্নয়ন?" "আপনার নীরবতা কি আপনার সম্মান, না আপনার ভয়?" "স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আমরা কেন লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কিনি?"

রাত তিনটায় তারা বের হতো। মেহজাবিন মার্কার পেন, আরিফ টর্চলাইট। তারা নির্জন দেয়াল খুঁজত। ব্যস্ত রাস্তার পাশে। মেট্রোরেলের স্টেশনে। বাস স্ট্যান্ডে। যেখানে মানুষ দেখবে।

লেখার পর তারা দ্রুত চলে যেত। হাঁটত আলাদা রাস্তা দিয়ে। যাতে কেউ সন্দেহ না করে।

কিন্তু একদিন রাতে বিপদ এলো।

তারা মিরপুরের একটা দেয়ালে লিখছিল। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামল। নেমে এলো তিনজন। আরিফ বুঝল, এরা পুলিশ নয়। এরা ছাত্রলীগের ক্যাডার।

একজন বলল, "তোরা এইসব কী লিখছিস?"

আরিফ বলল, "আমরা শুধু "

"চুপ! তোরা সরকারের বিরুদ্ধে লিখছিস। ভাবছিস আমরা জানি না?"

মেহজাবিন বলল, "আমরা সরকারের বিরুদ্ধে লিখিনি। আমরা শুধু প্রশ্ন করছি।"

"প্রশ্ন? তোদের প্রশ্ন করার অধিকার কে দিছে?"

তারা আরিফকে ধরল। মারতে গেল। কিন্তু মেহজাবিন চিৎকার করে উঠল। "সাহায্য! সাহায্য!" আশেপাশের কয়েকটা বাড়ির জানালা খুলে গেল। কয়েকজন মানুষ বেরিয়ে এলো। দেখে ক্যাডাররা ছেড়ে দিল। বলল, "পরে দেখব তোদের।" চলে গেল।

আরিফ আর মেহজাবিন দৌড়ে পালাল। তারা একটা রিকশা পেল। উঠে বসল। হাঁপাচ্ছে। ভয়ে কাঁপছে।

মেহজাবিন বলল, "আরিফ, আমরা বিপদে পড়ছি।"

আরিফ বলল, "আমি জানি। কিন্তু আমরা থামব না।"

মেহজাবিন তাকাল আরিফের দিকে। বলল, "না, থামব না।"

অধ্যায় ২২: প্রথম লাঠিচার্জ ও রাষ্ট্রের শরীরী রূপ

সেপ্টেম্বর মাস। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল। লিটারে দশ টাকা। সাথে সাথে বাড়ল সবকিছুর দাম। বাসভাড়া, রিকশাভাড়া, সবজি, মাছ। সাধারণ মানুষ হাহাকার করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র একটা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করল। শাহবাগে। দাবি: জ্বালানি তেলের দাম কমাতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

আরিফ আর মেহজাবিন সেই সমাবেশে যোগ দিল। তারা জানত, এটা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তারা ঠিক করেছে, নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।

সমাবেশ শুরু হলো। প্রায় পাঁচশ ছাত্র। তারা স্লোগান দিচ্ছে। "দাম কমাও, দাম কমাও।" "জনগণের দাবি মানতে হবে।"

হঠাৎ পুলিশ এলো। ট্রাক ভর্তি। তারা ঘিরে ফেলল সমাবেশস্থল। মাইকে ঘোষণা দিল, "এটা অবৈধ সমাবেশ। এখনই ছড়িয়ে যাও।"

ছাত্ররা বলল, "আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছি। এটা আমাদের অধিকার।"

পুলিশ বলল, "তোমাদের পাঁচ মিনিট সময়।"

পাঁচ মিনিট পর পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করল। টিয়ারশেল ছুড়ল। রাবার বুলেট। চারপাশ ধোঁয়ায় ভরে গেল। ছাত্ররা ছড়িয়ে পড়ল। কেউ দৌড়াচ্ছে। কেউ পড়ে যাচ্ছে। কেউ রক্তাক্ত হচ্ছে।

আরিফ মেহজাবিনের হাত ধরে দৌড়াচ্ছিল। কিন্তু ভিড়ে তাদের হাত ছুটে গেল। আরিফ পেছনে তাকাল। দেখল, মেহজাবিনকে দুজন পুলিশ ধরছে। সে চিৎকার করল, "মেহজাবিন!"

কিন্তু তার কণ্ঠ ডুবে গেল স্লোগান আর চিৎকারের শব্দে। সে ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু ভিড় তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। সে কিছু করতে পারল না।

পুলিশ মেহজাবিনকে ভ্যানে তুলল। আরও বিশজনকে। তারপর চলে গেল।

আরিফ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। হতভম্ব। তার চোখে জল। সে বুঝতে পারছে না, কী করবে।

সেদিন সে প্রথমবার রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ শারীরিক শক্তির স্বাদ পেল। রাষ্ট্র যখন চায়, তখন সে তার নাগরিকদের ওপর লাঠি চালায়। গুলি করে। বন্দি করে। এবং কোনো জবাবদিহিতা নেই।

অধ্যায় ২৩: কারাগারের লৌহকপাট

মেহজাবিনকে নিয়ে যাওয়া হলো কাশিমপুর কারাগারে। অভিযোগ: সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জনজীবন বিঘ্নিত করা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

আরিফ পাগলের মতো ছুটে গেল জেলের গেটে। কিন্তু তাকে ঢুকতে দিল না। বলল, "রিমান্ডে আছে। কেউ দেখতে পারবে না।"

আরিফ বলল, "কতদিন রিমান্ডে থাকবে?" তারা বলল, "জানি না। কোর্টের আদেশ লাগবে।"

আরিফ উকিল খুঁজল। একজন উকিল বলল, "আমি কেস নিতে পারব, কিন্তু ফি লাগবে লাখ দুয়েক।" আরিফের কাছে সেই টাকা নেই। সে মেহজাবিনের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করল। তারা এলো। কিন্তু তাদেরও টাকা নেই।

দিন গড়াতে লাগল। আরিফ প্রতিদিন জেলের গেটে যায়। দাঁড়িয়ে থাকে। মেহজাবিনকে একবার দেখার আশায়। কিন্তু দেখতে পায় না।

একমাস পর কোর্ট মেহজাবিনকে জামিন দিল। কিন্তু শর্ত হলো, তাকে মাসে একবার পুলিশ স্টেশনে হাজিরা দিতে হবে। এবং সে ক্যাম্পাস রাজনীতি করতে পারবে না।

মেহজাবিন বের হলো। আরিফ গেটে অপেক্ষা করছিল। তাকে দেখে দৌড়ে গেল। কিন্তু মেহজাবিন আর আগের মতো নেই। তার মুখ ফ্যাকাশে। চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে খুব কম কথা বলছে।

আরিফ জিজ্ঞেস করল, "তোমার সাথে ওখানে কী হয়েছে?"

মেহজাবিন চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আরিফ, আমি এখন কথা বলতে চাই না। প্লিজ।"

আরিফ বুঝল, কারাগার মেহজাবিনের ভেতরে কিছু ভেঙে দিয়েছে।

অধ্যায় ২৪: ভাঙা মানুষ

কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মেহজাবিন অনেক বদলে গেল। সে আর আগের মতো সাহসী নেই। আগের মতো কথা বলে না। বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকে।

আরিফ তাকে বুঝতে চাইল। বলল, "মেহজাবিন, তুমি আমাকে বলতে পারো, কী হয়েছিল?"

মেহজাবিন অনেকক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "আরিফ, কারাগারে... কারাগারে তারা আমাকে একটা ছোট্ট সেলে রেখেছিল। একা। দিনের পর দিন। কোনো আলো নেই। কোনো শব্দ নেই। শুধু অন্ধকার আর নীরবতা। আমি ভেবেছিলাম আমি পাগল হয়ে যাব।"

আরিফ তার হাত ধরল।

মেহজাবিন চোখ বন্ধ করল। বলল, "তারা প্রশ্ন করত, 'তুমি কার সাথে কাজ করো? কে তোমাকে টাকা দেয়? কোন দেশ থেকে তোমাদের নির্দেশ আসে?' আমি বলতাম, আমি কারো সাথে কাজ করি না। আমি শুধু একজন ছাত্রী। কিন্তু তারা বিশ্বাস করত না।"

আরিফ কাঁদছিল। বলল, "আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি।"

মেহজাবিন চোখ খুলল। বলল, "এটা তোমার দোষ নয়। এটা এই রাষ্ট্রের চরিত্র। যে কেউ প্রশ্ন করে, তাকে এভাবেই শাস্তি দেওয়া হয়।"

অধ্যায় ২৫: মিডিয়ার ভূমিকা

কারাগারে মেহজাবিনের থাকার খবর মিডিয়ায় এলো। কিন্তু তাদের বর্ণনা ছিল ভিন্ন। তারা লিখল, "জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত একদল ছাত্রছাত্রী গ্রেপ্তার।" "বিদেশী শক্তির এজেন্ট ধরা পড়েছে।"

আরিফ এসব পড়ে রাগে ফেটে পড়ল। সে জানে, মেহজাবিন কোনো জঙ্গি নয়। সে একজন সাধারণ ছাত্রী, যে শুধু প্রশ্ন করেছে।

কিন্তু মিডিয়া সত্য বলছে না। কারণ মিডিয়া রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। যেসব সংবাদপত্র স্বাধীনভাবে কথা বলে, তাদের ওপর চাপ দেওয়া হয়। কখনো বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কখনো সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরিফ বুঝল, সত্য এই দেশে একটা বিলাসিতা।

অধ্যায় ২৬: বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরবতা

মেহজাবিন যখন ক্যাম্পাসে ফিরে এলো, তখন সবাই তাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। যারা আগে তার বন্ধু ছিল, তারাও দূরে সরে গেল। কারণ মেহজাবিনের সাথে মিশলে তারাও সন্দেহের তালিকায় পড়ে যাবে।

মেহজাবিন একাকী হয়ে গেল। শুধু আরিফ তার পাশে রইল।

একদিন ক্লাসে শিক্ষক বললেন, "তোমরা রাজনীতি করবে না। পড়াশোনা করবে। এটাই তোমাদের দায়িত্ব।" মেহজাবিন হাত তুলল। বলল, "স্যার, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের কি দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই?"

শিক্ষক রাগ করলেন। বললেন, "তুমি আবার শুরু করো না। তোমার কারণে এই বিভাগের নাম খারাপ হয়েছে।"

মেহজাবিন চুপ করে গেল। বুঝল, বিশ্ববিদ্যালয়ও রাষ্ট্রের হাতিয়ার।

অধ্যায় ২৭: প্রেম ও যন্ত্রণার সহাবস্থান

কারাগার থেকে ফিরে মেহজাবিন আর আগের মতো নেই। তার আর সেই উৎসাহ নেই। সেই স্বপ্ন নেই। সে এখন ভয় পায়। রাতে ঘুম আসে না। দুঃস্বপ্ন দেখে। চিৎকার করে জেগে ওঠে।

আরিফ যতটুকু পারে, তার পাশে থাকে। তাকে সান্ত্বনা দেয়। বলে, "সব ঠিক হয়ে যাবে।" কিন্তু আরিফ নিজেও জানে না, কীভাবে ঠিক হবে।

তাদের প্রেম এখন একটা যন্ত্রণার ভাগাভাগি। তারা একে অপরকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা তাদের আনন্দ দেয় না। বরং দেয় এক ধরণের দায়িত্ব। একে অপরকে ধরে রাখার দায়িত্ব।

একদিন মেহজাবিন বলল, "আরিফ, আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে চাই।" আরিফ অবাক হলো। বলল, "কেন?" মেহজাবিন বলল, "কারণ আমি তোমার জীবন নষ্ট করতে চাই না। আমি এখন একটা ভাঙা মানুষ। পুলিশ আমাকে ফলো করছে। তোমার সাথে থাকলে তুমিও সমস্যায় পড়বে।"

আরিফ বলল, "আমি পরোয়া করি না। আমি তোমার পাশে থাকব।"

মেহজাবিন কাঁদল। বলল, "আরিফ, তুমি বোঝো না। আমি এখন আর সেই মেহজাবিন নেই, যাকে তুমি ভালোবেসেছিলে। আমি ভেঙে গেছি।"

আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, "ভাঙা মানুষও বেঁচে থাকার অধিকার রাখে। এবং আমি তোমার পাশে আছি।"

অধ্যায় ২৮: সমাজের দৃষ্টি

মেহজাবিনের গ্রেপ্তারের খবর তার গ্রামেও পৌঁছেছে। প্রতিবেশীরা কথা বলছে। বলছে, "মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেছে। জেলে গেছে।" মেহজাবিনের মা লজ্জায় মাথা নিচু করে হাঁটেন।

একদিন মেহজাবিনের চাচা এলো ঢাকায়। বলল, "মেহজাবিন, তুই এসব কী করছিস? মেয়ে হয়ে রাজনীতি? মেয়েদের কাজ হলো ঘরে বসে থাকা। পড়াশোনা করা। বিয়ে করা।" মেহজাবিন বলল, "চাচা, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি শুধু প্রশ্ন করেছি।" চাচা বলল, "প্রশ্ন? মেয়েদের প্রশ্ন করার দরকার নেই।"

এই সমাজ মেয়েদের নীরব থাকতে শেখায়। যে মেয়ে কথা বলে, তাকে 'বেয়াদপ' বলা হয়।

মেহজাবিন বুঝল, তার লড়াই শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। তার লড়াই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধেও।

অধ্যায় ২৯: আরিফের পরিবারের অবস্থা

আরিফের মা খবর পেলেন, আরিফ এক মেয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। যে মেয়ে জেলে গিয়েছিল। তিনি আরিফকে ডেকে বললেন, "বাবা, তুই কী করছিস? এই মেয়ের সাথে সম্পর্ক রেখ না। তোর ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে।"

আরিফ বলল, "মা, মেহজাবিন কোনো খারাপ মেয়ে না। সে শুধু সৎ। এবং আমি তাকে ভালোবাসি।"

মা বললেন, "ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না। তোর এখন চাকরি দরকার। স্থিতিশীল জীবন দরকার। এই মেয়ের সাথে থাকলে তুই কখনো সেটা পাবি না।"

আরিফ জানে, মা ঠিকই বলছেন। কিন্তু সে মেহজাবিনকে ছাড়তে পারবে না।

মেয়ের সাথে থাকলে তুই কখনো সেটা পাবি না।"

আরিফ জানে, মা ঠিকই বলছেন। কিন্তু সে মেহজাবিনকে ছাড়তে পারবে না।

অধ্যায় ৩০: অদৃশ্য দেয়াল

মেহজাবিন আর আরিফের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গেল। তারা একসাথে আছে, কিন্তু দূরে। মেহজাবিন তার যন্ত্রণা আরিফের সাথে শেয়ার করতে পারছে না। আরিফ তাকে বুঝতে চাইছে, কিন্তু পারছে না।

একদিন বৃষ্টির রাতে তারা দুজন টিএসসিতে বসে আছে। নীরবে। বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশ ভিজে যাচ্ছে। মেহজাবিন বলল, "আরিফ, আমরা হয়তো একসাথে থাকতে পারব না।"

আরিফ বলল, "কেন?"

মেহজাবিন বলল, "কারণ আমরা দুজনেই ভেঙে যাচ্ছি। এবং ভাঙা মানুষ একে অপরকে সারাতে পারে না।"

আরিফ কিছু বলল না। শুধু বৃষ্টি দেখতে লাগল। সেদিন রাতে তাদের দুজনের মনেই একটা প্রশ্ন জাগল: প্রেম কি যথেষ্ট? নাকি বেঁচে থাকার জন্য আরও কিছু দরকার?


চতুর্থ খণ্ড: ভাঙন ও আপস

অধ্যায় ৩১: মেহজাবিনের প্রত্যাবর্তন ও এক অচেনা দূরত্ব

কয়েক মাস পর মেহজাবিন আরেকটু স্বাভাবিক হলো। কিন্তু সে আর আগের মতো নেই। তার চোখের সেই উজ্জ্বল জিজ্ঞাসা এখন এক গভীর শূন্যতায় রূপ নিয়েছে। সে খুব কম কথা বলে। হাসে না। স্বপ্ন দেখে না।

আরিফ লক্ষ্য করল, কারাগার কোনো মানুষকে শুধু বন্দি করে না, তা তার ভেতরের প্রশ্ন করার ক্ষমতাটিকেও ধীরে ধীরে পিষে ফেলে। মেহজাবিন আর দেয়ালে লিখতে চায় না। সেমিনারে প্রশ্ন করে না। এমনকি আরিফের সাথে রাজনীতি নিয়ে কথাও বলে না।

একদিন আরিফ বলল, "মেহজাবিন, তুমি কি আর কখনো লিখবে না?" মেহজাবিন বলল, "না। আমি ক্লান্ত। আমি শুধু স্বাভাবিক জীবন চাই। পড়াশোনা শেষ করতে চাই। একটা চাকরি পেতে চাই। শান্তিতে থাকতে চাই।"

আরিফ বুঝল, রাষ্ট্র জিতে গেছে। তারা মেহজাবিনকে ভেঙে দিয়েছে। এবং এখন সে আর লড়াই করতে চায় না।

তাদের সম্পর্কের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হলো। তারা একসাথে থাকে, কিন্তু মনে হয় মাইলের দূরত্ব। আরিফ এখনও স্বপ্ন দেখে। কিন্তু মেহজাবিন স্বপ্ন ভুলে গেছে।

অধ্যায় ৩২: অদৃশ্য কালো তালিকা

আরিফের পড়াশোনা শেষ হলো। অনার্স পাস করল। ভালো রেজাল্ট। এখন তাকে চাকরির খোঁজ করতে হবে। সে বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত করল। ব্যাংক, কর্পোরেট অফিস, এনজিও।

কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে। যেখানেই সে ইন্টারভিউ দিতে যায়, প্রথমদিকে সব ঠিক থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে তাকে বলা হয়, "আমরা আপনাকে জানাব।" তারপর আর কোনো খবর আসে না।

একবার এক ব্যাংকের ইন্টারভিউতে আরিফের খুব ভালো হয়েছিল। ইন্টারভিউ প্যানেলের সবাই সন্তুষ্ট। তারা বলল, "আপনি সিলেক্টেড।" কিন্তু পরদিন ফোন এসে বলল, "দুঃখিত, আপনাকে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।"

আরিফ বুঝতে পারল না, কী সমস্যা। সে একজন বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারল, তার নাম একটা "সন্দেহভাজনদের তালিকায়" আছে। কারণ মেহজাবিনের সাথে তার সম্পর্ক।

আরিফ হতাশ হয়ে গেল। একটি 'অদৃশ্য কালো তালিকা' তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। রাষ্ট্র তাকে ভুলতে দেয় না। মধ্যবিত্তের জন্য চাকরি কেবল জীবিকা নয়, তা হলো আত্মসম্মান। যখন সেই সম্মানটুকু কেড়ে নেওয়া হয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে একটি জড় পদার্থে পরিণত হয়।

আরিফ বুঝল, এই দেশে সৎ হওয়া একটা অভিশাপ।

অধ্যায় ৩৩: সম্পর্কের বিচ্ছেদ

একদিন সন্ধ্যায় মেহজাবিন আরিফকে ডাকল। রমনা পার্কে। তারা একটা বেঞ্চে বসল। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। তারপর মেহজাবিন বলল, "আরিফ, আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া দরকার।"

আরিফ জানত এই কথা আসবে। কিন্তু তবুও শুনে ব্যথা পেল। বলল, "কেন?"

মেহজাবিন বলল, "কারণ আমরা একসাথে থাকলে শুধু একে অপরের ক্ষতি করছি। তোমার চাকরি হচ্ছে না আমার কারণে। আমার জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমরা একসাথে থাকলে শুধু আমাদের ক্ষতগুলোই মনে পড়ে।"

আরিফ বলল, "কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

মেহজাবিন চোখের জল মুছল। বলল, "আমিও তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। আমাদের বাঁচতে হবে। স্থিতিশীল হতে হবে। এবং একসাথে থাকলে আমরা কেউই স্থিতিশীল হতে পারব না।"

আরিফ কিছু বলল না। কারণ সে জানে, মেহজাবিন সত্যি বলছে।

কোনো ঝগড়া নয়, কোনো চিৎকার নয় কেবল এক ধরণের ক্লান্তিকর সম্মতি। তারা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। প্রেম এখানে পরাজিত হলো না, বরং বাস্তবতার চাপে নুয়ে পড়ল।

মেহজাবিন উঠে দাঁড়াল। বলল, "তুমি ভালো থেকো, আরিফ। তুমি একটা ভালো মানুষ। এবং আমি বিশ্বাস করি, একদিন তুমি সফল হবে।"

আরিফ বলল, "তুমিও ভালো থেকো।"

তারা বিদায় নিল। আরিফ বসে রইল বেঞ্চে। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে। পার্কের লাইট জ্বলছে। মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু আরিফ নড়ছে না। শুধু বসে আছে। নিঃশব্দে। একাকী।

অধ্যায় ৩৪: টুকরো টুকরো কাজ

চাকরি না পেয়ে আরিফ ছোটখাটো কাজ করতে শুরু করল। একটা কল সেন্টারে পার্ট টাইম কাজ। মাসিক বেতন দশ হাজার টাকা। রাত ন'টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। কাজ হলো ফোনে কথা বলা। গ্রাহকদের সমস্যা শোনা। সমাধান দেওয়া। কিন্তু বেশিরভাগ সময় গ্রাহকরা রাগ করে। গালাগাল দেয়। আরিফ চুপচাপ শোনে। বলে, "আমি দুঃখিত, স্যার। আমি চেষ্টা করছি।"

এই কাজে কোনো সম্মান নেই। কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু আরিফের বিকল্প নেই। তাকে মায়ের জন্য টাকা পাঠাতে হয়।

দিনের বেলা সে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। এখনও স্বপ্ন দেখে, হয়তো উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভালো কিছু করতে পারবে।

কিন্তু ক্লান্তি তাকে গ্রাস করছে। রাতে কাজ, দিনে ক্লাস। ঘুম তিন ঘণ্টা। খাওয়া-দাওয়া অনিয়মিত। স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে।

অধ্যায় ৩৫: বন্ধুদের সুবিধাবাদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা এখন সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কেউ বিসিএস দিচ্ছে। কেউ ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। কেউ বিদেশ যাচ্ছে। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু আরিফ আটকে আছে।

একবার এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হলো। বন্ধু জিজ্ঞেস করল, "তুই কী করছিস?" আরিফ বলল, "কল সেন্টারে কাজ করছি।" বন্ধু একটু অবাক হলো। বলল, "তোর তো ভালো রেজাল্ট ছিল। তাহলে ভালো চাকরি পেলি না কেন?" আরিফ বলল, "পাইনি।" বন্ধু বলল, "তুই নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা করেছিলি। নইলে চাকরি না পাওয়ার কথা না।"

আরিফ বুঝল, বন্ধু ভাবছে এটা তার নিজের দোষ। কেউ বুঝতে চাইছে না, রাষ্ট্র তার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে।

অধ্যায় ৩৬: মায়ের অসুস্থতা

একদিন আরিফ খবর পেল, মা অসুস্থ। সে দৌড়ে গেল। দেখল, মা বিছানায় শুয়ে আছে। জ্বর। কাশি। শরীর দুর্বল। আরিফ বলল, "মা, ডাক্তারের কাছে যাও।" মা বললেন, "টাকা নেই।" আরিফ বলল, "আমি জোগাড় করব।"

সে তার সঞ্চয় থেকে টাকা নিয়ে মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। পরীক্ষা হলো। ডাক্তার বললেন, "নিউমোনিয়া। হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।" আরিফ ভয় পেয়ে গেল। হাসপাতাল মানে খরচ। অনেক খরচ।

সে কোনোরকমে টাকা জোগাড় করল। ঋণ নিল। মাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করল। আবার সেই একই অবস্থা। ভিড়। নোংরা। চিকিৎসার অভাব। কিন্তু এটাই তাদের সামর্থ্য।

মা সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু আরিফ এখন ঋণে ডুবে গেল।

অধ্যায় ৩৭: মেহজাবিনের গ্রামে প্রত্যাবর্তন

আরিফ শুনল, মেহজাবিন ঢাকা ছেড়ে দিয়েছে। চলে গেছে গ্রামে। আরিফ একবার ভাবল, তার সাথে যোগাযোগ করবে। কিন্তু করল না। ভাবল, মেহজাবিন হয়তো শান্তি খুঁজছে। তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।

পরে এক বন্ধুর কাছে শুনল, মেহজাবিন গ্রামে একটা স্কুলে পড়াচ্ছে। শান্ত জীবন যাপন করছে। রাজনীতি থেকে দূরে। আরিফ ভাবল, হয়তো এটাই ভালো। মেহজাবিন হয়তো এখন শান্তিতে আছে।

কিন্তু আরিফ নিজে শান্তি পাচ্ছে না। তার মনে প্রশ্ন জাগে। এই দেশে কি সৎ মানুষ বাঁচতে পারে? নাকি বাঁচতে হলে আপস করতে হয়?

অধ্যায় ৩৮: শহরটি একটি কারাগার

আরিফ এখন ঢাকা শহরকে একটি বৃহৎ কারাগার মনে করে। কোনো শিক দিয়ে বাঁধা নেই, কিন্তু পালানোর উপায় নেই। সে প্রতিদিন একই রুটিনে চলে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা। ক্লাসে যাওয়া। রাতে কাজে যাওয়া। ফিরে আসা। ঘুমানো। আবার শুরু।

কোনো স্বপ্ন নেই। কোনো আনন্দ নেই। শুধু বেঁচে থাকার জন্য দৌড়ানো। আরিফ লক্ষ্য করে, তার চারপাশের মানুষগুলোও একই অবস্থায়। সবাই দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কেউ পৌঁছাচ্ছে না।

এক রবিবার আরিফ ছুটিতে। সে একা ঘুরতে বেরোলো। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল পুরান ঢাকায়। সেখানে পুরনো বাড়ি, সরু গলি, মসজিদ, মন্দির। একটা ভিন্ন ঢাকা। যেখানে সময় যেন থেমে আছে।

সে একটা চায়ের দোকানে বসল। চা খেতে খেতে দেখল, পাশের দোকানে একজন বুড়ো বসে আছে। বই পড়ছে। আরিফ কৌতূহলী হলো। জিজ্ঞেস করল, "আপনি কী পড়ছেন?" বুড়ো বলল, "রবীন্দ্রনাথ। গীতাঞ্জলি।" আরিফ বলল, "এখনও কেউ রবীন্দ্রনাথ পড়ে?" বুড়ো হাসল। বলল, "বাবা, সাহিত্য কখনো পুরনো হয় না। এটা মানুষের আত্মার খোরাক।"

আরিফ সেদিন কিছুটা শান্তি পেল। বুঝল, এই শহরেও কিছু মানুষ আছে, যারা মানবিকতা ধরে রেখেছে।

অধ্যায় ৩৯: আপসের প্রলোভন

একদিন এক পুরনো বন্ধু আরিফকে ফোন করল। বলল, "আরিফ, আমি তোর জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারি। তবে একটা শর্ত আছে। তোকে ছাত্রলীগে যোগ দিতে হবে।" আরিফ চুপ করে রইল। বন্ধু বলল, "দেখ, এটা কোনো বড় ব্যাপার না। শুধু নামে যোগ দিলেই হবে। কোনো কাজ করতে হবে না। তোর একটা ভালো চাকরি হবে। বেতন ত্রিশ হাজার। স্থায়ী।"

আরিফ প্রলুব্ধ হলো। ত্রিশ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে সে মাকে ভালো রাখতে পারবে। নিজে ভালো খেতে পারবে। ঋণ শোধ করতে পারবে।

কিন্তু তার বাবার মুখ মনে পড়ল। যিনি সারা জীবন সৎ ছিলেন। যিনি কখনো আপস করেননি। আরিফ বলল, "না। আমি পারব না।" বন্ধু বলল, "তুই বোকা। এভাবে কোনোদিন এগোতে পারবি না।"

ফোন কেটে গেল। আরিফ জানলো, সে হয়তো একটা সুযোগ হাতছাড়া করল। কিন্তু সে তার নীতি বিসর্জন দিতে পারল না।

অধ্যায় ৪০: একাকীত্বের গভীরতা

মেহজাবিন চলে যাওয়ার পর আরিফ একদম একা। কোনো বন্ধু নেই। কোনো সঙ্গী নেই। শুধু কাজ আর ক্লাস।

রাতে যখন সে একা হলের রুমে শুয়ে থাকে, তখন সিলিং দেখে। ভাবে, জীবনের মানে কী? সে কেন বেঁচে আছে? শুধু বেঁচে থাকার জন্য?

মাঝেমধ্যে মনে হয়, আত্মহত্যা করলে হয়তো শান্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু তারপরই মায়ের কথা মনে পড়ে। মা তার জন্য কত কষ্ট করছে। সে কি মাকে একা ফেলে যেতে পারবে?

না। সে পারবে না। তাকে বাঁচতে হবে। মায়ের জন্য।


পঞ্চম খণ্ড: উত্তরাধিকার

অধ্যায় ৪১: নতুন প্রজন্মের দেয়াল লিখন

পাঁচ বছর কেটে গেল। আরিফ এখন একটি মাঝারি পর্যায়ের কোম্পানিতে চাকরি করে। মাসিক বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। কোনোরকমে চলে যায়। সে এখন আর স্বপ্ন দেখে না। শুধু বেঁচে থাকে।

একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় বাসের জানালা দিয়ে দেখল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুরোনো দেয়ালটি আবার নতুন কিছু লেখায় ভরে উঠেছে।

"আমরা চুপ করব না।" "জলবায়ু ন্যায়বিচার এখনই।" "শিক্ষা বাণিজ্য নয়।"

আরিফ বাস থেকে নামল। কাছে গেল। দেখল, কয়েকজন তরুণ তরুণী দেয়ালে লিখছে। তাদের চোখে সেই একই আগুন। সেই একই স্বপ্ন। যা আরিফ আর মেহজাবিনের ছিল।

আরিফ কাছে গেল। একজন তরুণী লিখছে। আরিফ বলল, "তোমরা কী করছো?" তরুণী তাকাল। বলল, "আমরা প্রশ্ন করছি।" আরিফ মৃদু হাসল। বলল, "সাবধানে থেকো। রাষ্ট্র ভালোবাসে না যারা প্রশ্ন করে।" তরুণী বলল, "আমরা জানি। কিন্তু আমরা চুপ করতে পারি না।"

আরিফ বুঝল, নতুন প্রজন্ম আবার জেগে উঠেছে। তারা আরিফের গল্প জানে না, কিন্তু তারা আরিফের অভাবটুকু অনুভব করতে পারছে। এবং তারা সেই অভাবটুকু পূরণ করার চেষ্টা করছে।

আরিফ সেদিন বুঝল, তার আর মেহজাবিনের লড়াই বৃথা যায়নি। তারা যে বীজ বপন করেছিল, তা অঙ্কুরিত হয়েছে।

অধ্যায় ৪২: রাষ্ট্রের বিবর্তন ও আধুনিক দমন

রাষ্ট্র এখন আরও আধুনিক হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে এখন চিন্তাকেই কারাবন্দি করা হয়েছে। মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হাসতে ভয় পায়। একটা পোস্ট, একটা মন্তব্য এবং পুলিশ হাজির।

কিন্তু এই প্রবল চাপের নিচেই মানুষ আবার বেঁচে থাকার বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। আরিফ লক্ষ্য করল, মানুষের নীরবতা এখন এক ধরণের কৌশল। তারা সরাসরি কথা বলে না, কিন্তু রূপক ব

্যবহার করে। তারা প্রতিবাদ করে না, কিন্তু প্রশ্ন করে।

নতুন প্রজন্ম আরও চালাক। তারা জানে, কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ফাঁকি দিতে হয়। তারা ক্রিপ্টো ব্যবহার করে। ভিপিএন ব্যবহার করে। তারা এনক্রিপ্টেড মেসেজ পাঠায়।

রাষ্ট্র আর মানুষের মধ্যে এক ধরণের লুকোচুরি খেলা চলছে। রাষ্ট্র দমন করে, মানুষ পথ খুঁজে নেয়।

অধ্যায় ৪৩–৪৮: স্মৃতি, পরিবর্তন ও অপেক্ষা

পরবর্তী কয়েক বছর আরিফ নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকল। মা বুড়ো হচ্ছেন। আরিফ তাকে দেখাশোনা করে। চাকরি করে। কোনোরকমে চলে।

কিন্তু মাঝেমধ্যে মেহজাবিনের কথা মনে পড়ে। সে কেমন আছে? তার জীবন কেমন চলছে? আরিফ কখনো খোঁজ নেয়নি। ভেবেছে, হয়তো মেহজাবিন নতুন জীবন শুরু করেছে। হয়তো বিয়ে করেছে। সংসার করছে। আরিফ তাকে বিরক্ত করতে চায় না।

দেশ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই বদলটা কোন দিকে? ভালোর দিকে, নাকি খারাপের দিকে? আরিফ বুঝতে পারে না। মাঝেমধ্যে মনে হয়, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, পিছিয়ে যাচ্ছে।

অধ্যায় ৪৯: শেষ দেখা ও নীরব সম্মতি

দশ বছর পর।

আরিফ একটা কাজে গিয়েছিল ময়মনসিংহে। কাজ শেষে ফেরার সময় রাস্তায় একটা ছোট্ট লাইব্রেরি দেখল। "জ্ঞানালোক পাঠাগার।" আরিফ একটু ঢুকল। দেখল, ছোট্ট একটা ঘর। চারপাশে বইয়ের তাক। কয়েকজন মানুষ পড়ছে।

হঠাৎ এক কোণে একজন মহিলাকে দেখল। চশমা পরা। চুলে পাক ধরেছে। বই পড়ছে। আরিফ চমকে উঠল। মেহজাবিন!

সে কাছে গেল। মেহজাবিন মুখ তুলল। আরিফকে দেখে চমকে গেল। তারপর মৃদু হাসল। বলল, "আরিফ?"

আরিফ বলল, "হ্যাঁ।"

তারা লাইব্রেরির বাইরে গেল। কাছের একটা চায়ের দোকানে বসল। চুপচাপ। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। তারপর মেহজাবিন বলল, "তুমি কেমন আছো?"

আরিফ বলল, "ঠিক আছি। তুমি?"

মেহজাবিন বলল, "আমিও ঠিক আছি। এখানে একটা স্কুলে পড়াই। এই লাইব্রেরিটা আমিই চালাই। ছোট্ট একটা উদ্যোগ। গ্রামের বাচ্চাদের বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়া।"

আরিফ বলল, "চমৎকার।"

মেহজাবিন বলল, "তুমি?"

আরিফ বলল, "আমি ঢাকায় চাকরি করি। মাকে দেখাশোনা করি। সাধারণ জীবন।"

মেহজাবিন মাথা নাড়ল। বলল, "আরিফ, আমরা বীজ বপন করেছিলাম, গাছ দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়।"

আরিফ বুঝল, মেহজাবিন শান্তি পেয়েছে। সে আর অতীত নিয়ে কষ্ট পায় না। সে এখন বর্তমান নিয়ে বাঁচছে।

তারা এক ঘণ্টা একসাথে বসল। পুরনো দিনের কথা বলল। হাসল। কিছু স্মৃতি মনে করল। তারপর বিদায় নিল।

তাদের এই পুনর্মিলন কোনো মিলনের ইঙ্গিত নয়, বরং এক ধরণের বিদায়ের সুশোভন সমাপ্তি। তারা দুজন দুটো আলাদা পথে হেঁটেছে। এবং এখন তাদের পথ আর এক হবে না।

অধ্যায় ৫০: নিঃশব্দ সমাপ্তি

আরও পাঁচ বছর কেটে গেল। আরিফ এখন চল্লিশের কাছাকাছি। তার মাথায় পাক ধরেছে। চোখে ক্লান্তি।

এক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে আরিফ আবার সেই টিসিবির ট্রাকের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে। কেন? কারণ তেলের দাম আবার বেড়েছে। চালের দাম বেড়েছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু বেতন বাড়েনি।

লাইনটি আগের চেয়েও দীর্ঘ। আরিফ লাইনে দাঁড়িয়ে দেখল, তার সামনে এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। বয়স হবে বিশের কাছাকাছি। তার চোখে সেই একই রাগ, যা আরিফের ছিল বিশ বছর আগে। তরুণটি ফোনে কিছু পড়ছে। আরিফ উঁকি মেরে দেখল, সে একটা আর্টিকেল পড়ছে। শিরোনাম: "কেন আমরা এখনও লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কিনি?"

আরিফ মৃদু হাসল। এই প্রশ্ন তিরিশ বছর আগেও ছিল। আজও আছে।

শহরটি নিঃশব্দ। ট্রাফিক জ্যাম, হকারদের চিৎকার আর যান্ত্রিক কোলাহল সব আছে, শুধু মানুষের কণ্ঠস্বর নেই। কিন্তু দেয়ালগুলো আর চুপ নেই। বৃষ্টির ছাপে পোস্টারগুলো ধুয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু প্লাস্টারের নিচ থেকে এখনো সেই পুরনো লেখাগুলো উঁকি দিচ্ছে।

আরিফ বুঝতে পারে  নীরবতা ভাঙলে হয়তো বুলেটের ভয় থাকে, কিন্তু নীরবতা বজায় রাখলে আসে এক ধরণের পচন, যা পুরো জাতিকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়।

দেশ চুপ থাকে, কিন্তু দেয়াল কথা বলে।

সেদিন বিকালে, লাইন থেকে চাল নিয়ে ফেরার সময়, আরিফ আবার সেই দেয়ালের পাশ দিয়ে যায়। দেখে, নতুন একটা লেখা:

"আগামীকাল হবে।"

আরিফ থামল। পড়ল। তারপর এগিয়ে গেল।

হ্যাঁ। আগামীকাল হবে। হয়তো তার জীবদ্দশায় নয়। কিন্তু একদিন হবে। যেদিন এই দেশের মানুষ আর লাইনে দাঁড়াবে না। যেদিন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সেবক হবে, প্রভু নয়। যেদিন ভাত, ভালোবাসা আর মর্যাদা তিনটিই থাকবে প্রতিটি মানুষের জীবনে।

সেই দিনটির জন্য আরিফ অপেক্ষা করবে। নীরবে। ধৈর্য্য নিয়ে।

কারণ স্বপ্ন মরে না। শুধু ঘুমিয়ে থাকে।

সমাপ্ত।


 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অনন্ত

* শুরু  কি করব কিছু বুজতে পারছি না। অনেক দিন ধরেই চিন্তা ভাবনা করছি কিছু করব করব কিন্তু কিছু করা হচ্ছে না। এইদিকে এক মাস ধরে বসে আছি নতুন কিছু করব করব ভেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে শামিমের ফোন এলো। কিরে যাবি নাকি ? কোথায় যাওয়ার প্লান? চলে আয় টংয়ের দোকানে । তাও ভাই ভালো । টাকা পয়সার এখন যা টানা টানি অবস্থা । বাসায় ও টাকা চাইতে লজ্জা করে । খুবই এক ভয়ানক অবস্থা।" তুই না কি প্রজেক্ট হতে নিবি বলছিলি। ঐটার কি হল। আরে বললেই কি সব হয় নাকি ? এইসব করতে ফান্ডিং এর প্রয়োজন হয় । আচ্ছা আচ্ছা তুই টং এর দোকানে আয় তারপর কথা হবে। আচ্ছা ঠিক আছে আসছি তুই ও আয়। সন্ধ্যার সময় বাহিরে ভালোই ঠান্ডা পরেছে । হুডিটা পরে বেরিয়ে গেলাম । রাস্তায় অনেক বাতাস বইছে । টং এর দোকানে শামীমের কোন কোন খোঁজ পাওয়া গেল না কিন্তু এতক্ষণ এ ওর চলে আসার কথা ছিল। এই দিকে শালা ফোনটা ও রিসিভ করছে না । ও কি আমার সাথে মজা করছে নাকি?  আমি পকেটে চা-বিড়ি খাওয়ার টাকাই নিয়ে এসেছি। ২ টা সিগারেট কিনে বাড়ি ফিরে যাওয়াই উত্তম কালকে ওর সাথে হিসেব বরাবর করব। টং এর দোকানের একটু সামনে যেতেই একটা বাশ-বাগান পরে। এর পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো পা কা...

ভয় পেয়েছেন ভাই?

       কোম্পানির কাজের জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহের শেষে রহিম সাহেবকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে যেতে হয় । এই সপ্তাহেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি । ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে কিছুটা পথ পার হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো । ব্যাপারটা যেন না বলে আসা মেহমানের মতো লাগলো রহিম সাহেবের । ছাতাটাও বোধ হয় ট্রেনে ফেলে এসেছেন । এ নিয়ে ছাতা হারানোর সংখ্যা  মনে হয় হাফ সেঞ্চুরি পার হবে । কিছুটা সামনে যেতেই একটা বন্ধ চায়ের দোকান চোখে পড়ল । মাথাটাকে কিছুটা হলেও এই বৃষ্টির হাত থেকে বাচাতে পারবেন এই ভেবেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো । টিনের তলায় কিছুক্ষন দাড়াতেই চল্লিশ  বছর বয়সী এক লোক এশে পাশে দাড়ালো ।  “কি হে মশাই এই এলাকায় নতুন নাকি” “জি ভাই কাজের সুবাদে এখানে আসা আরকি” কেন যে এই কথা বলতে গেলাম এই ভেবে জিভ কাটলাম । “ তো কোথায় ঊঠবেন ?’’ “ হাটহাজারী তে একটা হোটেল বুক করেছিলাম এই বৃষ্টির জন্য মনে হচ্ছে যেতে দেরি হয়ে যাবে । আপনি বুঝি এই এলাকার বাসিন্দা?’’ একটু আগ্রহ নিয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করলাম । “ আজ্ঞে সেই রকম না , আবার বলতে গেলে বাসিন্দাও । আমি এখানে ৬ মাস হয়েছি এসেছি।” “ ওহ আচ্ছা । তা এলাকাটা খুব শুনশান...