সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সম্ভাবনা

 

এক

বৃষ্টি নামলেই রাতুলের ঘুম ভালো হয়। আজও তাই হয়েছে। জানালার পাশে শুয়ে সারারাত টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, টেরই পায়নি। ঘুম ভাঙল দুপুরের দিকে, রোদের তাপে গায়ে ঘাম জমে যাওয়ার পর। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিশেষ কোনো তাড়া অনুভব করল না। রাতুলের জীবনে তাড়া বলতে কিছু নেই। ও নিজেই বলে বেড়ায়, "আমি একটা ড্রিফটার, ভাই। যেদিকে বাতাস বয়, সেদিকেই যাই।"

কথাটা শুনতে যতটা রোমান্টিক লাগে, বাস্তবে ততটাই ফাঁকা। রাতুলের বয়স ছাব্বিশ। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করেও চাকরি করেনি একদিনও। মাঝে ছয় মাস একটা স্টার্টআপে কাজ করেছিল, তারপর একদিন হুট করে বলল, "আর ভালো লাগছে না এই জীবন" বাদ দিল সব । এরপর থেকে টুকটাক টিউশনি, মাঝে মাঝে ফ্রিল্যান্স কাজ, আর বাকি সময়টা রাস্তায় রাস্তায় হাঁটা। বাবা-মা প্রথমে অনেক বকাবকি করেছেন, এখন আর কিছু বলেন না। বলাটাও ছেড়ে দিয়েছেন, যেমন মানুষ কোনো রোগের সাথে মানিয়ে নেয়।

রাতুল অবশ্য নিজেকে অসুস্থ মনে করে না। ওর মনে হয়, বাকি সবাই একটা দৌড়ে নেমে গেছে, আর ও শুধু পাশ থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে। দৌড়টা কীসের জন্য, কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কেউ জানে না, তবু সবাই দৌড়াচ্ছে। রাতুলের সেই দৌড়ে নামতে ইচ্ছে করে না।

বিকেলে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে ছিল, হাতে একটা সিগারেট, কানে হেডফোন। ঠিক তখনই মেয়েটাকে প্রথম দেখল।

মেয়েটা বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসে ছিল, কোলে একটা নোটবুক, কিন্তু লিখছিল না। শুধু পানির দিকে তাকিয়ে ছিল, এমন একটা দৃষ্টিতে যেটা রাতুলের চেনা। ওই দৃষ্টিটা রাতুল নিজের চোখেও দেখেছে আয়নায়, মাঝে মাঝে। কিছু একটা হারানোর দৃষ্টি, কিন্তু ঠিক কী হারিয়েছে সেটা নিজেও জানে না।

কাক ডাকল একটা খুব কর্কশ আওয়াজ , লেকের পানিতে একটা মাছরাঙা ঝুপ করে ডুব দিয়ে উঠল। মেয়েটা চমকে উঠল, তারপর আবার নিজের জগতে ফিরে গেল।

রাতুল কিছু না ভেবেই মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "মাছরাঙাটা প্রতিদিন এই সময় আসে।"

মেয়েটা তাকাল, ভ্রু কুঁচকে। একটা অচেনা লোক হুট করে কথা বলছে দেখে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে গেল। কিছু বলল না।

রাতুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, "কিছু না, এমনি বললাম।" তারপর আবার নিজের মতো তাকিয়ে রইল পানির দিকে।

এভাবেই শুরু। কোনো নাটকীয়তা ছাড়া, কোনো বিশেষ মুহূর্ত ছাড়া। দুইজন মানুষ একই বেঞ্চে বসেছিল, একজন কথা বলেছিল, আরেকজন শোনেনি। কিন্তু পরের দিন আবার দুইজনেই এলো, একই সময়ে, একই বেঞ্চে। এবং তার পরের দিনও।

তৃতীয় দিন বৃষ্টি নামল হঠাৎ, প্রবল বেগে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। মানুষজন ছোটাছুটি করে ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে লাগল। রাতুল উঠল না। ভিজতে ভিজতে বসে রইল বেঞ্চে, মাথা পেছনে হেলিয়ে, চোখ বন্ধ করে, যেন বৃষ্টিটাকে গায়ে মাখছে। মেয়েটা কয়েক গজ দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, শুকনো থাকার চেষ্টায়, কিন্তু কৌতূহলী চোখে রাতুলের দিকে তাকিয়ে রইল।

"আপনি ভিজছেন কেন?" শেষমেশ জিজ্ঞেস করেই ফেলল।

রাতুল চোখ না খুলেই বলল, "বৃষ্টিতে ভেজার একটা নিয়ম আছে। ছাতা মাথায় দিলে বৃষ্টিটা অনুভব করা যায় না, শুধু তার শব্দ শোনা যায়। আমি অনুভব করতে চাই।"

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর, নিজেও অবাক হয়ে নিজের ওপর, গাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসে পড়ল, ভিজতে ভিজতে। কোনো কথা হলো না দুইজনের মধ্যে, শুধু বৃষ্টির শব্দ, লেকের পানিতে অসংখ্য গোল ঢেউয়ের ছাপ, আর দুইজন মানুষের নিঃশ্বাসের ছন্দ। এই নীরবতাটুকুই যেন প্রথম সত্যিকারের কথোপকথন হয়ে রইল ওদের মধ্যে।

সপ্তাহখানেক পর, এক সন্ধ্যায়, রাতুল লক্ষ্য করল অন্তরা একটা রিকশা দেখলেই একটু সরে দাঁড়ায়, আর প্রাইভেট কার দেখলে ওর হাত অজান্তেই মুঠো হয়ে যায়। ব্যাপারটা প্রথমবার নয়, কিন্তু সেদিন প্রথম রাতুল জিজ্ঞেস করে বসল, খুব সহজভাবে, যেন আবহাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করছে।

"তুমি গাড়ি দেখলে ভয় পাও?"

অন্তরা থমকে গেল। "কীভাবে বুঝলে?"

"তোমার হাত।" রাতুল ইশারা করল। "মুঠো হয়ে যায়।"

অন্তরা নিজের হাতের দিকে তাকাল, যেন প্রথমবার লক্ষ্য করছে। "হ্যাঁ। এখনো গাড়িতে উঠতে পারি না। রিকশা ঠিক আছে, বাস ঠিক আছে, কিন্তু প্রাইভেট কারে উঠলেই মনে হয়... সেই মুহূর্তটা আবার ফিরে আসবে।"

রাতুল কিছু বলল না, শুধু মাথা নাড়ল, বুঝল। জোর করে সমাধান দিল না, "তুমি চেষ্টা করো, দেখবে ঠিক হয়ে যাবে" গোছের কোনো বাক্য বলল না। শুধু বলল, "তাহলে আমরা হাঁটি। এই শহরে হাঁটার মতো অনেক জায়গা আছে, যেগুলো গাড়িতে করে কখনো দেখা যায় না।"

মেয়েটার নাম অন্তরা। দ্বিতীয় সপ্তাহের এক বিকেলে নিজেই বলল, কোনো প্রশ্ন ছাড়াই, "আমার নাম অন্তরা।"

রাতুল মাথা নাড়ল, "রাতুল।"

"আপনি রোজ এখানে বসে থাকেন কেন?"

"আপনিও তো বসে থাকেন।"

অন্তরা একটু হাসল, প্রথমবারের মতো। সেই হাসিটা এমন ছিল যে মনে হচ্ছিল বহুদিন পর মুখের পেশিগুলো এই কাজে ব্যবহার হচ্ছে, একটু জড়তা নিয়ে।

তারপর থেকে কথা বলা শুরু হলো। প্রথমে টুকটাক, আবহাওয়া নিয়ে, লেকের পাখি নিয়ে, শহরের ট্রাফিক নিয়ে। রাতুল কখনো জোর করে প্রশ্ন করেনি। অন্তরার চোখে একটা দেয়াল ছিল, রাতুল সেটা বুঝত, আর সেই দেয়ালে হাত না দিয়েই পাশে বসে থাকত। এই জিনিসটাই সম্ভবত অন্তরাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল। ওর জীবনে সবাই প্রশ্ন করত। বাবা-মা প্রশ্ন করত, বান্ধবীরা প্রশ্ন করত, এমনকি সাইকোলজিস্টও প্রশ্ন করত। শুধু রাতুল করত না।

একদিন অন্তরা জিজ্ঞেস করল, "তোমার পরিবার সম্পর্কে কখনো বলো না তো। কেমন ওরা?"

রাতুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, "বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন, রিটায়ার করেছেন কয়েক বছর আগে। সারাজীবন একটা নির্দিষ্ট রুটিনে চলেছেন— সকাল আটটায় অফিস, বিকেল পাঁচটায় বাসা, রাত দশটায় ঘুম। আমার মনে হতো, উনি কখনো নিজের জন্য বাঁচেননি, শুধু দায়িত্বের জন্য বেঁচেছেন। আমি যখন চাকরি ছেড়ে দিলাম, উনি খুব রাগ করেছিলেন। বলেছিলেন, 'তুই একটা অকৃতজ্ঞ ছেলে, আমি সারাজীবন কষ্ট করেছি তোর জন্য, আর তুই এসব ছেড়ে দিলি?'"

"তুমি কী বলেছিলে?"

"কিছু বলিনি। কারণ আমি জানতাম, উনি যা বলছেন সেটা ভুল না। কিন্তু আমি এটাও জানতাম, আমি যদি ওই রুটিনে ঢুকে যাই, আমিও একদিন উনার মতো হয়ে যাব— এমন একজন মানুষ, যে জীবনের শেষে এসে বুঝবে যে সে কখনো সত্যিকারের বাঁচেইনি।" রাতুল আকাশের দিকে তাকাল, সন্ধ্যার আলো তখন কমলা রঙে বদলে যাচ্ছিল। "মা অবশ্য বোঝেন কিছুটা। মাঝে মাঝে গোপনে টাকা পাঠান, বাবাকে না জানিয়ে। বলেন, 'তুই তোর মতো করে বাঁচ, শুধু নিজেকে কষ্ট দিস না।'"

অন্তরা রাতুলের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, একটা নতুন চোখে, যেন এতদিনে প্রথমবার ছেলেটাকে পুরোপুরি দেখছে— শুধু হাসিখুশি, দিকহীন একটা মানুষ না, বরং এমন একজন, যে নিজের বাবার ভয়কে দেখেছে খুব কাছ থেকে, আর সেই ভয়ের বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস করেছে, নিজের মতো করে, যদিও তার মূল্য দিতে হয়েছে একাকিত্ব দিয়ে।

"তুমি ভয় পাও না?" অন্তরা জিজ্ঞেস করল নরম গলায়।

"পাই," রাতুল স্বীকার করল, প্রথমবারের মতো এত সরাসরি। "কিন্তু আমি ঠিক করেছি, ভয়টাকে আমার সিদ্ধান্ত নিতে দেব না।"

মাস দুয়েক পর, এক সন্ধ্যায়, হঠাৎ অন্তরা নিজে থেকেই বলে ফেলল।

"আমার একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল, দুই বছর আগে।" কণ্ঠস্বরে কাঁপুনি ছিল না, বরং এক ধরনের ক্লান্ত সমতা ছিল, যেন কথাগুলো বহুবার মনে মনে বলে বলে ধার কমিয়ে ফেলেছে। "আমি আর আমার একটা বন্ধু গাড়িতে ছিলাম। ও মারা গেছে। আমি বেঁচে গেছি। কেন বেঁচে গেছি, এখনো বুঝি না।"

রাতুল কিছু বলল না সাথে সাথে। শুধু পাশে বসে রইল, চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর বলল, "বোঝার দরকার নেই। কিছু জিনিস বোঝার জন্য না, সহ্য করার জন্য।"

অন্তরা তাকাল ওর দিকে, অবাক হয়ে। এই প্রথম কেউ ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল না, উপদেশ দিল না, কারণ খোঁজার চেষ্টা করল না। শুধু বলল, একটা বাক্য, আর থেমে গেল।

সেদিন রাতে অন্তরা প্রথমবার ভালো ঘুমাল, দুই বছরের মধ্যে।

এরপর থেকে দুইজনের সম্পর্কটা অন্যরকম মোড় নিল। প্রতিদিন বিকেলে দেখা হতো, কখনো লেকের পাড়ে, কখনো পুরান ঢাকার গলিতে হাঁটতে হাঁটতে, কখনো রিকশায় করে শহর ঘুরে বেড়াতে। রাতুল অন্তরাকে নতুন নতুন জায়গায় নিয়ে যেত— পুরনো বইয়ের দোকান, নদীর পাড়ের ভাঙা ঘাট, রাত দশটার নির্জন রাস্তা যেখানে শুধু কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। অন্তরা প্রথমে ভয় পেত, তারপর আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেল। প্রতিটা নতুন জায়গা যেন ওর ভেতরের বন্ধ একটা দরজা একটু একটু করে খুলে দিচ্ছিল।

"তুমি মানুষটা অদ্ভুত," একদিন অন্তরা বলল, রিকশায় বসে, বাতাসে চুল উড়ছে। "সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তা করে, তুমি করো না। কিন্তু তুমিই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছ।"

রাতুল হাসল, "চিন্তা করলে মানুষ সমাধান খুঁজতে চায়। আমি সমাধান খুঁজি না। শুধু পাশে থাকি।"

"কেন?"

"কারণ আমি জানি, সব কিছুর সমাধান হয় না। কিছু জিনিস শুধু বহন করতে হয়। আস্তে আস্তে হালকা লাগে, কিন্তু পুরোপুরি যায় না।"

অন্তরা কিছু বলল না, শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠল। এই ছেলেটার কথায়, ওর নির্লিপ্ততায়, ওর কোনো কিছু প্রমাণ করতে না চাওয়ার ভঙ্গিতে একটা নিরাপত্তা ছিল, যা অন্তরা বহুদিন খুঁজেছিল আর পায়নি।

একদিন শুক্রবার সকালে রাতুল হঠাৎ প্রস্তাব দিল, "চলো, শহরের বাইরে যাই। সোনারগাঁও।"

অন্তরা প্রথমে ইতস্তত করল, তারপর রাজি হয়ে গেল। বাসে করে যেতে হবে, দীর্ঘ পথ, জানালার পাশে বসে অন্তরা প্রথমবারের মতো দুই বছরের মধ্যে কোনো যানবাহনে দীর্ঘ সময় কাটাল, ভয়ে হাত মুঠো করে ধরে রেখেছিল সিটের হাতল, কিন্তু নামল না।

পানাম নগরে পৌঁছে দুইজনে হাঁটল ভাঙা প্রাসাদের গলিপথ দিয়ে, শত বছরের পুরনো দালানগুলোর ছায়ায়। দেয়ালে বট গাছের শিকড় জড়িয়ে ধরেছিল ইটের গায়ে, যেন প্রকৃতি নিজের হাতে সময়কে থামিয়ে রেখেছে। অন্তরা একটা ভাঙা জানালার ফ্রেমের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলল, রাতুল দূর থেকে দেখল ওর ছায়া পড়ছে পুরনো ইটের দেয়ালে, রোদের আলোয় ঝিলমিল করছে ধুলোকণা।

"জানো," অন্তরা বলল, হাঁটতে হাঁটতে, "এই জায়গাটায় এসে মনে হচ্ছে, সব কিছুরই একটা শেষ আছে, কিন্তু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কিছু একটা থেকে যায়। এই দালানগুলো, এই মানুষগুলো যারা এখানে থাকত, তারা নেই, কিন্তু দেয়ালগুলো এখনো দাঁড়িয়ে। গল্পগুলো এখনো আছে।"

রাতুল কিছু বলল না সাথে সাথে। শুধু ওর পাশে হাঁটল, দুইজনের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ল ইটের রাস্তায়, বিকেলের আলো তির্যকভাবে এসে পড়ছিল ভাঙা জানালাগুলো দিয়ে। ফেরার পথে বাসে অন্তরা ঘুমিয়ে পড়ল রাতুলের কাঁধে মাথা রেখে, প্রথমবারের মতো এত সহজভাবে, এত নিশ্চিন্তে। রাতুল জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, গাছপালা ছুটে যাচ্ছিল পেছনে, আর বুকের ভেতর একটা অচেনা উষ্ণতা টের পেল, যেটার নাম দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না তখনো।



মাস ছয়েক এভাবেই কাটল। অন্তরা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে লাগল। রাতে ঘুমাতে পারত, বন্ধুদের সাথে আবার আড্ডা দিতে শুরু করল, এমনকি একদিন নিজে থেকেই গাড়িতে উঠল, দুই বছর পর প্রথমবার, ভয়ে হাত কাঁপলেও।

রাতুল লক্ষ্য করত সব, কিন্তু কখনো নিজের কৃতিত্ব নিতে চাইত না। "তুমি নিজেই এগোচ্ছ," বলত ও। "আমি শুধু পাশে হাঁটছি।"

একদিন সন্ধ্যায়, পুরান ঢাকার এক গলিতে হাঁটতে হাঁটতে, একটা পুরনো বাড়ির সামনে থমকে দাঁড়াল অন্তরা। বাড়িটার দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, জানালার কাঠ পচে খসে পড়েছে জায়গায় জায়গায়, তবু একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য ছিল ভাঙা ইটের গায়ে।

"এরকম একটা বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করে," অন্তরা বলল, দেয়ালে হাত বুলিয়ে। "সব পুরনো, সব ভাঙা, কিন্তু তবু দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ চলে গেছে, কিন্তু বাড়িটা এখনো টিকে আছে।"

"তুমিও তো টিকে আছ," রাতুল বলল।

অন্তরা হাসল না এবার, চোখ নামিয়ে নিল। "টিকে থাকা আর বাঁচা এক জিনিস না, রাতুল।"

"জানি। কিন্তু একদিন হবে। বাড়িগুলো তো একসময় নতুন বানানো হয়, তারপর পুরনো হয়। ভেতরে ভেতরে সংস্কার হয়, রং হয়। তুমি এখন সংস্কারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ, এই যা।"

একবার, প্রায় মাস চারেকের মাথায়, একটা মোটরসাইকেল হঠাৎ জোরে হর্ন বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে গেল, আর অন্তরা সেই মুহূর্তে জমে গেল সম্পূর্ণভাবে, শ্বাস আটকে গেল, চোখ বড় বড় হয়ে গেল, শরীর কাঁপতে লাগল থরথর করে। রাতুল সাথে সাথে বুঝল কী হচ্ছে— প্যানিক অ্যাটাক। ও কোনো বড় কথা বলল না, শুধু অন্তরার সামনে বসে পড়ল রাস্তার ধারেই, চোখে চোখ রেখে, নিচু গলায় বলতে লাগল, "আমার দিকে তাকাও। শুধু আমার দিকে তাকাও। শ্বাস নাও, ধীরে। এক, দুই, তিন।"

অন্তরার হাত রাতুলের হাত খামচে ধরল, নখ বসে গেল চামড়ায়, কিন্তু রাতুল সরল না, হাত সরাল না। মিনিট দুয়েক পর কাঁপুনি কমে এলো, শ্বাস স্বাভাবিক হলো ধীরে ধীরে। অন্তরা লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল, "আমি দুঃখিত, এভাবে..."

"দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই," রাতুল বলল, শান্ত গলায়। "শরীর মনে রাখে, মন যা ভুলতে চায় তাও।"

অন্তরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল, একটা সত্যিকারের হাসি, দাঁত দেখা যাওয়া হাসি, যেটা রাতুল আগে কখনো দেখেনি। "তুমি মানুষটা অদ্ভুত রকম আশাবাদী, জানো? অথচ নিজের জীবন নিয়ে তোমার কোনো পরিকল্পনাই নেই।"

"পরিকল্পনা থাকলে আশাবাদী হওয়া যায় না," রাতুল হেসে বলল। "পরিকল্পনা মানেই তো একটা নির্দিষ্ট ফলাফলের প্রত্যাশা। প্রত্যাশা না থাকলে হতাশও হওয়া যায় না।"

দিনগুলো এভাবেই গড়াতে লাগল। কোনো একদিন রাতুল অন্তরাকে নিয়ে গেল পুরনো একটা বইয়ের দোকানে, যেখানে ধুলো জমা বইয়ের গন্ধ আর পাতা ওল্টানোর শব্দ ছাড়া কিছু ছিল না। অন্তরা একটা কবিতার বই কিনল, রাতুল কিনল একটা মানচিত্রের বই, পুরনো ঢাকার। কোনো একদিন সন্ধ্যায় বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসে দুইজনে মিলে সিঙাড়া খেল, নদীর দুর্গন্ধ আর পাশের লঞ্চঘাটের হর্নের শব্দের মধ্যে বসে, অথচ সেই মুহূর্তটা কোনোভাবে সুন্দর মনে হচ্ছিল। প্রতিটা ছোট ছোট মুহূর্ত জমতে জমতে একটা জগত তৈরি হচ্ছিল, যেটা শুধু ওদের দুইজনের।

কিন্তু অন্তরার চোখে অন্য একটা গল্প লেখা হচ্ছিল। প্রতিদিন বিকেলের অপেক্ষা, রাতুলের হাসি দেখলে বুকের ভেতর একটা মৃদু কাঁপুনি, ওর কথা বলার ভঙ্গি নকল করার চেষ্টা, এসব অন্তরা নিজেও প্রথমে বুঝতে পারেনি। যেদিন বুঝল, সেদিন রাতে অনেকক্ষণ জেগে ছিল, ছাদে দাঁড়িয়ে, শহরের আলো দেখতে দেখতে।

ও ভালোবেসে ফেলেছে। এবং এই ভালোবাসাটা এমন একটা মানুষকে, যে কখনো ওর দিকে সেই চোখে তাকায়নি।

রাতুল অবশ্য তখনো টের পায়নি। ওর কাছে অন্তরার সাথে সময় কাটানো ছিল সহজ, আরামদায়ক, কিন্তু রোমান্টিক কোনো অনুভূতি ছিল না। রাতুলের মনে রোমান্টিক অনুভূতি বলতে কিছু ছিল কি না, সেটাই ও নিজে জানত না। ওর মনে হতো, ভালোবাসাও একটা দৌড়, আর ও দৌড়ে নামতে চায় না।

দুই

একদিন রাতে, বৃষ্টি নামার আগে আগে, রাতুল বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথাটা ভার লাগছিল, কেমন একটা অচেনা ক্লান্তি। ভাবল হয়তো ঠান্ডা লেগেছে। চোখ বুজতেই ঘুম নেমে এলো, গভীর, স্বপ্নহীন মনে হওয়া একটা ঘুম।

কিন্তু ঘুমের ভেতরেই একটা জগত খুলে গেল।

রাতুল দেখল, ও একটা ছোট্ট বাসায় আছে, রান্নাঘরের গন্ধ ভেসে আসছে, দেয়ালে বাচ্চাদের আঁকা ছবি টাঙানো। বয়স বেড়েছে ওর, চেহারায় একটা পরিণত ভাব, চোখের কোণে সামান্য বলিরেখা। হাতে একটা অফিসের ব্যাগ, গায়ে ফরমাল শার্ট। জানালা দিয়ে বিকেলের আলো পড়ছে ঘরের মেঝেতে।

সকালটা শুরু হয়েছিল এক অন্যরকম ব্যস্ততায়— রান্নাঘরে অন্তরা ডিম ভাজছিল, তেলের ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ ভেসে আসছিল, পাশে টোস্টার থেকে পোড়া রুটির হালকা গন্ধ। মৃদুলা তখনো ঘুম থেকে ওঠেনি পুরোপুরি, চোখ কচলাতে কচলাতে ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছিল, চুল এলোমেলো, ইউনিফর্মের একটা বোতাম ভুল ঘরে লাগানো।

"বাবা, বোতাম লাগিয়ে দাও না," মৃদুলা বলল, হাই তুলতে তুলতে।

রাতুল হাঁটু গেড়ে বসল মেয়ের সামনে, আঙুল দিয়ে সাবধানে বোতামগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলল, "স্কুলে যেতে ভালো লাগে না, তাই না?"

"একটুও না," মৃদুলা মুখ বাঁকিয়ে বলল। "অঙ্ক ক্লাস সবচেয়ে খারাপ।"

"আমারও খারাপ লাগত," রাতুল হাসল। "কিন্তু জানো কী, একদিন দেখবে অঙ্কই সবচেয়ে মজার লাগছে।"

"সেটা কবে হবে?"

"যেদিন তুমি বড় হয়ে যাবে।"

মৃদুলা ভুরু কুঁচকে কিছু একটা ভাবল, তারপর সিরিয়াস মুখে বলল, "আমি বড় হতে চাই না। তাহলে তো তোমরা বুড়ো হয়ে যাবে।"

অন্তরা রান্নাঘর থেকে হেসে উঠল, "এসো, নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।" রাতুল মেয়েকে কোলে তুলে চেয়ারে বসিয়ে দিল, নিজে বসল পাশে, আর অন্তরা প্লেট সাজিয়ে দিতে দিতে রাতুলের কাঁধে হালকা করে হাত ছুঁইয়ে দিল, এক সেকেন্ডের জন্য, কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই, শুধু ভালোবাসার একটা সাধারণ, নিঃশব্দ প্রকাশ হিসেবে। এই ছোট্ট স্পর্শটুকুই রাতুলের সারাদিনের সবচেয়ে দামি মুহূর্ত হয়ে থাকত, যদিও তখন সেটা বোঝার সময় কখনো ছিল না।

দৃশ্যটা বদলে গেল, যেমন স্বপ্নে হয়, এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে লাফ দিয়ে। এবার বিকেল, রোদ নরম হয়ে এসেছে জানালায়।

"বাবা!" একটা ছোট্ট কণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, আর একটা আট-নয় বছরের মেয়ে দৌড়ে এসে ওর পা জড়িয়ে ধরল। মেয়েটার চোখদুটো অবিকল অন্তরার মতো, কিন্তু হাসিটা যেন রাতুলেরই প্রতিচ্ছবি।

"মৃদুলা, আস্তে," একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো রান্নাঘর থেকে। অন্তরা বেরিয়ে এলো, হাতে একটা তরকারির খুন্তি, চুলগুলো এলোমেলো করে বাঁধা, মুখে সেই হাসি যেটা রাতুল আগে কখনো এত সহজ, এত নিশ্চিন্ত দেখেনি।

"তুমি আজ তাড়াতাড়ি ফিরেছ," অন্তরা বলল।

"মিটিং তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল," রাতুল উত্তর দিল, নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নিজেই অবাক হলো— এত সাবলীল, এত ঘরোয়া। "মৃদুলা, তুমি হোমওয়ার্ক করেছ?"

"করেছি! আম্মু চেক করে দিয়েছে!" মেয়েটা লাফাতে লাফাতে বলল।

এই দৃশ্যটা রাতুলের কাছে অদ্ভুত রকম বাস্তব লাগছিল, প্রতিটা বিস্তারিত জিনিস স্পষ্ট— দেয়ালের রং, মেঝের কার্পেটের নকশা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ, বাইরের রাস্তায় ফেরিওয়ালার হাঁক। এটা কোনো ঝাপসা স্বপ্ন ছিল না, বরং এমন এক জীবন, যা রাতুল যেন সত্যিই যাপন করছিল, একইসাথে দেখছিলও, দুইভাবে।

রাত নামল। খাওয়াদাওয়ার পর মৃদুলাকে ঘুম পাড়িয়ে অন্তরা আর রাতুল বারান্দায় বসল। শহরের আলো দূরে জ্বলছিল। অন্তরা রাতুলের কাঁধে মাথা রাখল।

মাঝের মুহূর্তগুলো রাতুল দেখল ঝলকের মতো, একের পর এক, যেন কেউ একটা অ্যালবামের পাতা দ্রুত উল্টে যাচ্ছে। মৃদুলার প্রথম হাঁটা, রান্নাঘরের মেঝেতে হামাগুড়ি দিতে দিতে হঠাৎ দুই পায়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া, অন্তরার চিৎকার করে রাতুলকে ডাকা, "দেখো দেখো, ও হাঁটছে!" রাতুলের অফিস থেকে ছুটে আসা, দুইজনে মিলে হাততালি দেওয়া, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্জন ঘটে গেছে।

আরেকটা ঝলকে দেখল, একটা সাধারণ ঝগড়া— অন্তরা রেগে আছে কারণ রাতুল ভুলে গিয়েছিল মৃদুলার স্কুলের প্যারেন্ট-টিচার মিটিংয়ের কথা। "তুমি সবসময় এরকম করো," অন্তরা বলছিল, রাগে গলা কাঁপছিল। রাতুল অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে নাটকীয়ভাবে ক্ষমা চাইতে লাগল, এমনভাবে যে অন্তরা রাগ ধরে রাখতে না পেরে হেসে ফেলল। এই সাধারণ, তুচ্ছ ঝগড়াটাও রাতুলের কাছে অসম্ভব মূল্যবান মনে হচ্ছিল, দেখতে দেখতে, জানতে জানতে যে এসবের মূল্য কতটা।

আরেকটা দৃশ্যে দেখল মৃদুলার জন্মদিন, বাসার ছাদে বেলুন টাঙানো, কয়েকজন প্রতিবেশীর বাচ্চা এসেছে, অন্তরা একটা কেক বানিয়েছে নিজের হাতে, একটু বাঁকাচোরা কিন্তু মৃদুলা তাতেই মহাখুশি। রাতুল ক্যামেরায় ছবি তুলছিল, আর প্রতিটা হাসি, প্রতিটা মোমবাতি নেভানোর মুহূর্ত যেন সময়ের মধ্যে জমাট বেঁধে থাকছিল।

দৃশ্যগুলো আবার ফিরে এলো বারান্দায়, রাতের আকাশের নিচে, অন্তরার মাথা রাতুলের কাঁধে।

"মনে আছে, লেকের পাড়ে প্রথম যেদিন কথা বলেছিলাম?" অন্তরা বলল, স্বরে একটা মৃদু হাসি। "তুমি বলেছিলে মাছরাঙাটা প্রতিদিন আসে।"

"মনে আছে," রাতুল বলল। বলতে গিয়ে বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিল, এক অদ্ভুত মায়া, যেন এই মুহূর্তটা ও অনেক আগে থেকেই চিনত, শুধু নামটা জানত না।

"তুমি জানো, আমি তখনই বুঝেছিলাম," অন্তরা বলল, "যে তুমি আমার জীবনটা বাঁচিয়ে দিয়েছ। শুধু পাশে থেকেই।"

রাতুল কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যটা কেঁপে উঠল, যেমন পানির উপর ঢিল পড়লে প্রতিবিম্ব কাঁপে। একটা তীক্ষ্ণ, ধাতব শব্দ কানে বাজল। সব অন্ধকার হয়ে গেল এক মুহূর্তে।

তারপর রাতুল দেখল— একটা হাসপাতালের করিডোর। সাদা আলো, ফরম্যালিনের গন্ধ, কান্নার শব্দ। ও নিজে দাঁড়িয়ে আছে, জামাকাপড় এলোমেলো, হাতে রক্তের দাগ। একজন ডাক্তার এগিয়ে এলেন, মুখে সেই ভারী নীরবতা, যা সবসময় খারাপ খবরের আগে আসে।

"আমরা দুঃখিত। মা এবং মেয়ে, দুইজনকেই বাঁচানো যায়নি। ট্রাকটা সিগন্যাল ভেঙে সরাসরি গাড়িতে এসে পড়েছিল। ইনস্ট্যান্ট ছিল, কোনো কষ্ট পাননি।"

রাতুল শুনল নিজের গলা থেকে একটা শব্দ বেরোতে, এমন একটা শব্দ যা মানুষ কখনো ইচ্ছে করে বের করে না, যেটা বুকের সবচেয়ে গভীর জায়গা থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। ও দেখল নিজেকে মেঝেতে বসে পড়তে, দুই হাতে মুখ ঢেকে।

দৃশ্যটা আরও একবার কেঁপে উঠল, আর রাতুল নিজেকে দেখল আরও কয়েক বছর পরের এক সংস্করণে— চুলে পাক ধরেছে, চোখে গভীর শূন্যতা, একা একটা ফাঁকা বাসায় বসে আছে, টেবিলে একটা ছবির ফ্রেম, অন্তরা আর মৃদুলার। ও ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "যদি তোমার সাথে দেখাই না হতো..."

আর তখনই ঘুম ভেঙে গেল।

রাতুল শোয়া থেকে ধড়মড় করে উঠে বসল, শরীর ঘামে ভেজা, বুক ধড়ফড় করছে। জানালার বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল, সেই একই বৃষ্টির শব্দ, কিন্তু এখন সেটা আর শান্তির শব্দ মনে হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল একটা সতর্কবার্তার মতো।

অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল রাতুল, নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে, যেন সেখানে এখনো সেই স্বপ্নের রক্তের দাগ লেগে আছে। ও জানত না এটা কী ছিল— স্বপ্ন, ভবিষ্যতের এক ঝলক, নাকি নিজের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো ভয়ের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেল ওর মনে, নির্মম এক স্পষ্টতায়— যদি অন্তরার সাথে থাকা মানে একদিন ওকে হারানো, তাহলে ভালো, তার চেয়ে ভালো, শুরুতেই দূরে সরে যাওয়া।

রাতুল জানত না ভালোবাসা কাকে বলে। কিন্তু ভয় কাকে বলে, সেটা সেই রাতে ভালোভাবেই বুঝে গেল।

তিন

পরের দিন বিকেলে অন্তরা লেকের পাড়ে এসে দেখল রাতুল নেই। প্রথমে ভাবল হয়তো দেরি হচ্ছে। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করল, তারপর ফোন করল। ফোন বেজে গেল, ধরল না কেউ।

পরের দিনও একই ঘটনা। তারপর তার পরের দিনও।

চার দিন পর অন্তরা নিজেই রাতুলের বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খুলল রাতুল নিজেই, চোখের নিচে কালি, দাড়ি কামায়নি কয়েকদিন।

"তুমি ঠিক আছ?" অন্তরার কণ্ঠে উদ্বেগ।

"হ্যাঁ," রাতুল সংক্ষেপে বলল, চোখ এড়িয়ে। "একটু ব্যস্ত ছিলাম।"

"ব্যস্ত? তুমি? চার দিন ফোন ধরনি, লেকে আসনি— কী হয়েছে বলো তো?"

রাতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও জানত এই মুহূর্তটা আসবে, কিন্তু কীভাবে সামলাবে সেটা ঠিক করে উঠতে পারেনি। "অন্তরা, শোনো। আমার মনে হয় আমাদের এভাবে প্রতিদিন দেখা করাটা... ঠিক না।"

অন্তরার মুখ থেকে রং সরে গেল এক মুহূর্তে। "মানে?"

"আমি জানি না ঠিক কীভাবে বলব। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমি তোমার জীবনে একটা... জটিলতা তৈরি করছি। তোমার নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময়, নিজের মতো করে এগোনোর সময়। আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়াটা তোমার জন্য ভালো না।"

"এসব তুমি হঠাৎ কেন বলছ?" অন্তরার গলা কাঁপছিল। "গত ছয় মাস তুমি বলে এসেছ পাশে থাকবে। আর এখন হঠাৎ—"

"আমি ভুল ছিলাম," রাতুল বলল, নিজের কথাগুলো নিজের কানেই বিশ্রী লাগছিল, কিন্তু থামল না। "আমার উচিত হয়নি এত জড়িয়ে যাওয়া। আমি এমনিতেই একটা দিকহীন মানুষ, অন্তরা। আমার সাথে জড়ালে তুমিও দিকহীন হয়ে যাবে।"

মিথ্যেটা এত সহজে বেরিয়ে এলো যে রাতুল নিজেই অবাক হলো। ও জানত আসল কারণ সেই স্বপ্ন, সেই দুর্ঘটনা, সেই মৃদুলা নামের মেয়েটা যে কখনো জন্মায়নি অথচ যার হাসি রাতুলের বুকে এখনো গেঁথে আছে। কিন্তু এসব বলার কোনো উপায় ছিল না। কে বিশ্বাস করবে?

অন্তরা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, চোখে পানি জমছিল কিন্তু গড়াতে দিল না। তারপর শুধু বলল, "ঠিক আছে।" আর ঘুরে হাঁটা দিল, একবারও পেছনে না তাকিয়ে।

অন্তরা কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও থেমে গেল একবার, ঘুরে তাকাল, যেন শেষবারের মতো কিছু একটা বলতে চাইছিল। রাতুল তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, চোখ নামিয়ে। অন্তরা কিছু বলল না শেষমেশ, শুধু ঠোঁট কামড়ে ধরে আবার ঘুরে হাঁটতে শুরু করল, এবার আর না থেমে।

রাতুল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল অন্তরা রাস্তার মোড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ পেল, কিন্তু নিজেকে বোঝাল— এটাই ভালো। এটাই সঠিক। এভাবেই মৃদুলা নামের সেই মেয়েটা কখনো জন্মাবে না, এভাবেই সেই ট্রাক, সেই সিগন্যাল, সেই করিডোরের সাদা আলো— কিছুই ঘটবে না। ও ইতিহাস বদলে দিয়েছে, নিজেকে বলল রাতুল। ও একজনকে বাঁচিয়েছে।

কিন্তু তখনও ও জানত না, ভাগ্য বদলানো এত সহজ না।

চার

সেই রাতে, দরজা বন্ধ করার পর, রাতুল অনেকক্ষণ মেঝেতে বসে রইল, পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে। ঘরের প্রতিটা কোণে অন্তরার স্মৃতি ছড়িয়ে ছিল— জানালার পাশে রাখা সেই কবিতার বইটা, যেটা অন্তরা একদিন এখানে ভুলে রেখে গিয়েছিল আর নিতে ভুলে গিয়েছিল, টেবিলে পড়ে থাকা একটা রিকশা পেইন্টিংয়ের পোস্টকার্ড, যেটা ওরা একসাথে পুরান ঢাকা থেকে কিনেছিল। রাতুল উঠে গিয়ে বইটা হাতে নিল, পাতা উল্টাল, কোথাও কোথাও অন্তরার হাতের লেখায় টুকরো টুকরো মন্তব্য লেখা ছিল পেন্সিলে, একটা লাইনের পাশে ছোট্ট করে লেখা "এটা ঠিক আমার মতো।"

রাতুল বইটা বন্ধ করে বুকে চেপে ধরল, চোখ বন্ধ করে। নিজেকে বারবার বলল, এটাই সঠিক, এটাই দরকার ছিল, কিন্তু বুকের ভেতরের ব্যথাটা কোনো যুক্তি মানল না।

এরপরের মাসগুলো রাতুলের জন্য এক ধরনের শাস্তির মতো কেটেছিল। প্রতিদিন বিকেলে লেকের পাড়ে যেত, একা বসে থাকত সেই একই বেঞ্চে, যেন অন্তরা ফিরে আসবে। কখনো আসত না। একবার দূর থেকে দেখেছিল অন্তরাকে, বন্ধুদের সাথে হাসছে, কিন্তু কাছে যায়নি।

এর মধ্যে কয়েকজন বন্ধু রাতুলকে অন্য মেয়েদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, ভেবেছিল হয়তো তাতে মন ভালো হবে। রাতুল দুই-একবার দেখাও করেছিল, চায়ের কাপ হাতে বসে থেকেছিল কারো সামনে, কথা বলেছিল, হেসেছিলও মাঝে মাঝে। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছিল, ও যেন একটা মঞ্চে অভিনয় করছে, নিজের ভূমিকা মুখস্থ বলে যাচ্ছে, অথচ ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। একদিন একটা মেয়ে সরাসরি বলেই ফেলল, "তুমি এখানে আছ, কিন্তু তোমার মন অন্য কোথাও। কাউকে ভুলতে পারছ না, তাই না?"

রাতুল সেদিনের পর আর কারো সাথে দেখা করার চেষ্টা করেনি। বুঝে গিয়েছিল, অন্তরার জায়গাটা এখনো খালি পড়ে আছে, আর সেই জায়গায় জোর করে কাউকে বসানো যায় না।

মাস ছয়েক পর একটা সাধারণ পরিচিতের মাধ্যমে জানতে পারল, অন্তরা একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। নাম ফরহাদ, ব্যাংকে চাকরি করে, সেটেল্ড রাতুলের ঠিক বিপরীত। রাতুল খবরটা শুনে অদ্ভুত এক স্বস্তি অনুভব করল, আবার একই সাথে বুকের ভেতর একটা তীক্ষ্ণ ব্যথাও।

এক বছরের মাথায় অন্তরার বিয়ে হয়ে গেল ফরহাদের সাথে। রাতুল দাওয়াত পায়নি, পাওয়ার কথাও না। শুধু ফেসবুকে একটা ছবি দেখেছিল, অন্তরা লাল শাড়িতে, পাশে ফরহাদ, দুইজনের মুখেই হাসি। ছবিটা দেখে রাতুল অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর ফোনটা বন্ধ করে রেখে দিল।

নিজেকে বোঝাল, এটাই তো চেয়েছিলাম। ও নিরাপদ এখন। ও সুখী হবে, অন্য কারো সাথে, আর সেই দুর্ঘটনা— সেই ট্রাক, সেই সিগন্যাল— কখনো ঘটবে না, কারণ আমি আর ওর জীবনে নেই।

একবার, বিয়ের কয়েক মাস পর, রাতুল আর অন্তরার হঠাৎ দেখা হয়ে গেল নিউমার্কেটে, কাকতালীয়ভাবে। অন্তরা তখন ফরহাদের সাথে ছিল, হাতে কেনাকাটার ব্যাগ, মুখে সাধারণ, ঘরোয়া একটা হাসি। রাতুলকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকাল, তারপর সৌজন্যতার হাসি দিয়ে বলল, "কেমন আছ?"

"ভালো," রাতুল বলল, নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। "তুমি?"

"ভালো আছি।" অন্তরা একবার ফরহাদের দিকে তাকাল, তারপর আবার রাতুলের দিকে। চোখে কিছু একটা ছিল, প্রশ্নের মতো, অথবা অভিযোগের মতো, রাতুল ঠিক বুঝতে পারল না। "চলি তাহলে।"

দুইজন হেঁটে চলে গেল ভিড়ের মধ্যে, আর রাতুল দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ, দোকানের সাইনবোর্ডগুলোর দিকে না তাকিয়ে, রিকশার ঘণ্ট না শুনে, শুধু বুকের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গার দিকে মনোযোগ দিয়ে। এই ফাঁকা জায়গাটা কখনো ভরাট হবে না, ও জানত, কিন্তু তবু নিজেকে বোঝাল যে এটাই তো সঠিক কাজ ছিল।

সময় গড়িয়ে গেল। রাতুল নিজের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল, আগের মতোই দিকহীন, কিন্তু এখন সেই দিকহীনতার মধ্যে একটা নতুন ভার যোগ হয়েছিল, একটা নীরব শোক, যেটার নাম ও নিজেও জানত না।

শীত এলো, চলে গেল। বসন্তে কৃষ্ণচূড়া ফুটল রাস্তার ধারে, লাল রঙে ছেয়ে গেল শহরের কিছু কিছু গলি, অথচ রাতুলের চোখে সেই রং কোনো আনন্দ বয়ে আনল না। বর্ষা এলো আবার, সেই একই বৃষ্টি, যা একদিন ওকে ঘুম পাড়াত, এখন শুধু জানালার কাচে শব্দ করে বয়ে যেত, আর রাতুল শুয়ে শুয়ে সেই শব্দ শুনত, ঘুম না এসে।

তিন বছর পর, এক সন্ধ্যায়, রাতুল একটা চায়ের দোকানে বসে ছিল। পাশের টেবিলে কেউ একটা পত্রিকা রেখে গিয়েছিল। এমনি চোখ বুলাতে বুলাতে একটা খবরের দিকে চোখ আটকে গেল।

"রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় গৃহবধূর মৃত্যু।"

চায়ের দোকানের রেডিওতে তখন পুরনো একটা গান বাজছিল, আশেপাশের টেবিলে মানুষজন হাসাহাসি করছিল কোনো তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে, রাস্তায় রিকশার ঘন্টা বাজছিল একটার পর একটা। এই সাধারণ, উদাসীন জগতটা কিছুই টের পেল না, অথচ রাতুলের ভেতরে সব কিছু থমকে গেল এক মুহূর্তে।

নামটা পড়ার সাথে সাথে রাতুলের হাত কাঁপতে লাগল। অন্তরা। বয়স আটাশ। একটা বাসের সাথে সংঘর্ষে তার প্রাইভেট কার দুর্ঘটনার শিকার হয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু।

রাতুল অনেকক্ষণ নড়তে পারল না। চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে গেল সামনে, চারপাশের মানুষজনের গলার আওয়াজ যেন দূরে সরে গেল, শুধু কানের ভেতর একটা শব্দ বাজতে লাগল— ধ্বনি না, বরং একটা প্রশ্ন, যেটা আগে কখনো এভাবে সামনে আসেনি।

তাহলে কি এটাই হওয়ার ছিল? আমি সরে গিয়েছিলাম, তবুও ও মারা গেল?

সেদিন রাতে রাতুল ঘুমাতে পারল না। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল সেই ছয় মাস, সেই লেকের পাড়ের বেঞ্চ, সেই মৃদুলা নামের মেয়েটা যাকে ও কখনো জন্মাতে দেয়নি। ভাবল, যদি ও সরে না যেত, তাহলে কি অন্তরা তবু বাঁচত না? নাকি একই ট্রাক, একই সিগন্যাল, শুধু অন্য একটা গাড়িতে, অন্য একটা জীবনে ওকে খুঁজে নিত?

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। শুধু একটা ভয়ংকর সন্দেহ জন্ম নিল রাতুলের ভেতরে হয়তো মৃত্যু একটা নির্দিষ্ট সময়, একটা নির্দিষ্ট তারিখ, যেটা বদলানো যায় না। শুধু তার সাথে জড়িয়ে থাকা সুখের মুহূর্তগুলো, সেগুলোই বদলানো যায়। আর ও নিজের হাতে সেই সুখটুকু কেড়ে নিয়েছে, অন্তরার কাছ থেকে, নিজের কাছ থেকে, শুধু ভয়ের কারণে।

একদিন, প্রায় দুই বছর পর, রাতুল হাঁটতে হাঁটতে না চাইতেও পৌঁছে গেল সেই লেকের পাড়ে, সেই একই বেঞ্চের সামনে। বসল না, শুধু দূর থেকে তাকিয়ে রইল। বেঞ্চটা একই আছে, রং একটু উঠে গেছে, কাঠের একটা কোণ ভেঙে গেছে সময়ের সাথে সাথে। একটা নতুন জুটি বসে আছে সেখানে এখন, হাসছে, কথা বলছে, নিজেদের মতো একটা জগত তৈরি করছে, ঠিক যেমন একদিন রাতুল আর অন্তরা করেছিল।

মাছরাঙাটা তখনো আসছিল, একই সময়ে, একই ঝুপ শব্দে পানিতে ডুব দিচ্ছিল। প্রকৃতির কাছে সময় বলে কিছু নেই, রাতুল ভাবল। পাখিটা জানে না কে চলে গেছে, কে ফিরে আসেনি। শুধু মানুষই মনে রাখে, শুধু মানুষই একটা বেঞ্চের সাথে একটা মুখ জড়িয়ে ফেলে চিরদিনের জন্য।

রাতুল ফিরে এলো সেদিন, কিছু না বলে, কাউকে না জানিয়ে। কিন্তু সেই রাতে ঘুমাতে গিয়ে বহুদিন পর প্রথমবার নিজেকে প্রশ্ন করল, সত্যিই কি ও অন্তরাকে বাঁচিয়েছে, নাকি শুধু নিজেকে ভয় থেকে বাঁচিয়েছে, আর সেই ভয়টাকে একটা মহৎ ত্যাগের মোড়কে মুড়ে নিজের কাছে সহনীয় করে তুলেছে?

প্রশ্নটা মাথায় নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল সেদিন, উত্তর না পেয়ে।

পাঁচ

সেই রাতেই আবার ঘুম নেমে এলো, কিন্তু এবার ভিন্নরকম। রাতুল টের পেল ও আবার সেই অচেনা জগতে ঢুকছে, কিন্তু এবার দৃশ্যটা আলাদা।

একটা ধূসর, অস্পষ্ট জায়গা। না ঘর, না রাস্তা, বরং কুয়াশার মতো কিছু একটা চারদিকে, যার মধ্যে দিয়ে অস্পষ্ট আলো ছড়িয়ে আছে। রাতুল দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে, একা।

তারপর সামনে একজন এসে দাঁড়াল। মানুষটার চেহারা রাতুলের নিজের, কিন্তু বয়সে অনেক বড়, চুলে পাক ধরা, চোখে এক গভীর ক্লান্তি, যেটা শুধু বহু বছরের একাকিত্ব থেকে আসে।

"তুমি কে?" রাতুল জিজ্ঞেস করল, যদিও উত্তরটা মনে হচ্ছিল ও নিজেই জানে।

"আমি তোমার একটা ভবিষ্যৎ," লোকটা বলল, কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তার নিচে চাপা একটা বেদনা। "একটা সম্ভাবনা, যেটা তুমি বেছে নিয়েছিলে।"

"আমি বুঝছি না।"

"তুমি ভেবেছিলে, ওকে এড়িয়ে গেলে ওকে বাঁচাবে। তুমি ভেবেছিলে, তোমার সাথে থাকলেই ওর মৃত্যু হবে, তাই তুমি দূরে সরে গেলে। কিন্তু দেখো কী হলো।" লোকটা হাত নাড়ল, আর চারপাশের কুয়াশা সরে গিয়ে একটা দৃশ্য ফুটে উঠল অন্তরার শেষযাত্রা, ফরহাদ কাঁদছে, আর দূরে দাঁড়িয়ে আছে রাতুল নিজে, চুপচাপ, কারো সাথে কথা না বলে।

"ও তো মারাই গেল," রাতুল ফিসফিস করে বলল। "তাহলে আমার সরে যাওয়াটা অর্থহীন ছিল?"

"মৃত্যু অনিবার্য ছিল, রাতুল। সেটা তুমি বদলাতে পারোনি, পারবেও না। কিন্তু যেটা তুমি বদলে দিয়েছ, সেটা হলো ওর জীবনের সবচেয়ে সুখী বছরগুলো।" লোকটার কণ্ঠে এবার প্রথমবারের মতো তীব্রতা এলো। "আমার তোমার আসল সময়রেখায়, তুমি ওকে বিয়ে করেছিলে। তোমাদের একটা মেয়ে হয়েছিল, মৃদুলা। দশ বছর তোমরা একসাথে ছিলে, ভালোবাসায়, হাসিতে, ছোট ছোট ঝগড়ায়, প্রতিটা সাধারণ সন্ধ্যায়। তারপর দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল, সত্যি, কিন্তু তার আগে দশটা বছর ছিল, যা কেউ কেড়ে নিতে পারত না।"

"সেই দশটা বছরে," বৃদ্ধ লোকটা আরও বলল, কণ্ঠে এক ধরনের দূরবর্তী আনন্দ ফুটে উঠল, স্মৃতিচারণের সুরে, "প্রতিটা শুক্রবার সকালে আমরা তিনজন মিলে বাজারে যেতাম, মৃদুলা কাঁধে বসে থাকত আমার। অন্তরা রান্না করত, আমি বাসনকোসন ধুতাম, ঝগড়া হতো টুকটাক, তারপর মিটেও যেত। একবার আমরা কক্সবাজার গিয়েছিলাম, মৃদুলার তখন পাঁচ বছর, ও প্রথমবার সমুদ্র দেখে এত ভয় পেয়েছিল যে কোলে উঠে বসেছিল আর নামতেই চায়নি। পরে অবশ্য পুরো বিকেল পানিতে খেলেছিল, হাসতে হাসতে। অন্তরা ছবি তুলেছিল শয়ে শয়ে। সেই ছবিগুলো এখনো আমার ফোনে আছে, দেখি মাঝে মাঝে।" লোকটা থামল একটু, গলা ভারী হয়ে এলো। "এই স্মৃতিগুলো তোমার নেই, রাতুল। তোমার সময়রেখায় এসব কখনো ঘটবে না। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ— এই স্মৃতিগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে আমি একা রয়ে গেছি, এমন একটা জগতে যেটা তুমি কখনো জানবে না, কারণ তুমি বেছে নিয়েছিলে অন্য পথ।"

রাতুল অনুভব করল বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ছে, নতুন করে। "আর আমি সেই দশটা বছর কেড়ে নিলাম, ওকে বাঁচাব ভেবে।"

"তুমি ভেবেছিলে মৃত্যু এড়ানো যায়। কিন্তু মৃত্যু এড়ানো যায় না, রাতুল। শুধু জীবনটা কীভাবে কাটাবে, সেটাই তোমার হাতে থাকে। তুমি ওকে বাঁচাওনি। তুমি শুধু ওর কাছ থেকে ওর সবচেয়ে সুখের সময়টা কেড়ে নিয়েছ। নতুন সময়রেখায় ও কম সুখী ছিল, কম ভালোবাসা পেয়েছিল, আর তারপরও একই পরিণতি পেয়েছে।"

রাতুল মাথা নাড়ল, কিছু বোঝার চেষ্টা করছিল, কিন্তু বুকের ভেতরটা এত ভারী হয়ে ছিল যে চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। "কিন্তু এটা তো... এটা তো অন্যায়। আমি তো ভালো চেয়েছিলাম।"

"ভালো চাওয়া আর ভালো করা এক জিনিস না।" বৃদ্ধ লোকটার কণ্ঠে এবার কোনো রাগ ছিল না, শুধু একটা গভীর ক্লান্তি, যেন এই কথাগুলো বলতে বলতে বহুবার নিজেকেও ক্ষমা করার চেষ্টা করেছে। "তুমি ভয় পেয়েছিলে হারানোর। কিন্তু ভয় থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত কখনো ভালোবাসার সিদ্ধান্ত হয় না, রাতুল। ভয় শুধু নিজেকে বাঁচায়, অন্যকে না।"

চারপাশের কুয়াশা একটু নড়ে উঠল, যেন বাতাস বইছে কোথাও, অথচ কোনো বাতাস অনুভব হচ্ছিল না। রাতুল তাকিয়ে দেখল, দূরে, কুয়াশার ভেতর দিয়ে, আরেকটা অস্পষ্ট দৃশ্য ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে— মৃদুলা বড় হয়ে উঠছে, স্কুলের ইউনিফর্ম পরে দৌড়ে যাচ্ছে বাসস্ট্যান্ডের দিকে, হাসছে, পেছনে ফিরে হাত নাড়ছে। এই দৃশ্যটা কোনোদিন ঘটবে না, রাতুল বুঝল, এই নির্দিষ্ট হাসিটা, এই নির্দিষ্ট দৌড়টা, কোনোদিন বাস্তবে রূপ নেবে না, কারণ রাতুল নিজের হাতে সেই সম্ভাবনাটাকে মুছে দিয়েছে।

"আমি কি সেটা ফিরিয়ে আনতে পারি?" রাতুল জিজ্ঞেস করল, প্রায় ফিসফিস করে।

"না। যা গেছে তা গেছে। কিন্তু যা এখনো আসেনি, সেটা এখনো তোমার হাতে।"

"তাহলে সময় বলে কিছু নেই? অতীত, ভবিষ্যৎ, সব একসাথে আছে কোথাও?"

বৃদ্ধ লোকটা একটু হাসল, ক্লান্ত কিন্তু কোমল একটা হাসি। "আমি জানি না, রাতুল। আমি শুধু একটা সম্ভাবনা, মনে আছে? আমার কাছে দর্শনের উত্তর নেই। আমি শুধু জানি, তুমি যা অনুভব করছ, সেটা সত্যি। ব্যথাটা সত্যি। ভালোবাসাটা সত্যি ছিল। বাকি সব— সময়, নিয়তি, সমান্তরাল জগত— এসব নিয়ে ভাবা তোমার কাজ না। তোমার কাজ শুধু এটুকু বোঝা যে, তুমি একটা সুযোগ পেয়েছ, আবার নতুন করে বাঁচার। সেটা কাজে লাগাও।"

"কিন্তু যদি আমি আবার কাউকে ভালোবাসি, আর আবার হারাই?"

"তাহলে হারাবে।" কথাটা নির্মম শোনাল, কিন্তু তার মধ্যে কোনো নিষ্ঠুরতা ছিল না, শুধু একটা সহজ, অনিবার্য সত্য। "প্রত্যেকেই হারায়, রাতুল। প্রত্যেকের গল্পই একদিন শেষ হয়। এটাই একমাত্র নিশ্চয়তা। কিন্তু তুমি যদি হারানোর ভয়ে ভালোবাসা এড়িয়ে চলো, তাহলে তুমি হারানোটাকে আটকাচ্ছ না, শুধু ভালোবাসাটাকে হারাচ্ছ, আগেভাগেই, নিজের হাতে।"

কুয়াশা আরও ঘন হয়ে এলো, রাতুলের চারপাশ থেকে সব আকার মুছে যেতে লাগল ধীরে ধীরে। বৃদ্ধ লোকটার অবয়ব প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, শুধু কণ্ঠস্বরটা রয়ে গেল, চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল যেন।

রাতুল হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সেই অস্পষ্ট জায়গায়, মাথা নিচু করে। "তাহলে কী করা উচিত ছিল আমার?"

লোকটা— বৃদ্ধ রাতুল, ভবিষ্যতের রাতুল, অথবা যাই হোক না কেন— নিচু হয়ে বসল ওর সামনে, চোখে চোখ রেখে। "আমরা কেউই ঠিক করতে পারি না কেউ কতদিন থাকবে। এটা আমাদের হাতে নেই। যেটা হাতে আছে, সেটা হলো, যতদিন সে থাকে, ততদিন তাকে কতটা ভালোবাসব, কতটা ভালো করে সময়টা কাটাব। মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ভালোবাসা যায়।"

রাতুল চোখ তুলে তাকাল। "তুমি আমার ভবিষ্যৎ বললে। কিন্তু যদি আমি এখন অন্যরকম কিছু করি, তাহলে তুমি তো থাকবে না।"

লোকটা মৃদু হাসল, প্রথমবারের মতো, একটা করুণ কিন্তু শান্তির হাসি। "আমি তোমার ভবিষ্যৎ না, রাতুল। আমি তোমার একটা সম্ভাবনা। আমি এমন একটা পথ, যেটা তুমি এখনো বেছে নাওনি। প্রতিটা সিদ্ধান্তের সাথে নতুন নতুন সম্ভাবনা জন্ম নেয়, আর পুরনোগুলো কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়। আমি সেরকমই একটা কুয়াশা। তুমি চাইলে আমাকে সত্যি করে তুলতে পারো, অথবা অন্য কোনো পথ বেছে নিতে পারো।"

কুয়াশা ঘন হয়ে আসতে লাগল ওদের চারপাশে। বৃদ্ধ রাতুলের অবয়ব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

"যাওয়ার আগে," রাতুল তাড়াহুড়ো করে বলল, "বলো, আমি কী করব?"

শেষ কথাগুলো যেন বাতাসের ভেতর থেকে ভেসে এলো, ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে যেতে— "যতদিন পাবে, ততদিন ভালো করে বাঁচো। ভালো করে ভালোবাসো। বাকিটা তোমার হাতে নেই, রাতুল। কখনোই ছিল না।"

ছয়

রাতুলের ঘুম ভাঙল ভোরবেলা, জানালা দিয়ে হালকা আলো আসছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল, ছাদের দিকে তাকিয়ে, স্বপ্নের প্রতিটা টুকরো মনে করার চেষ্টা করছিল।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল। ঘরটা একদম স্বাভাবিক ছিল, সবকিছু ঠিক আগের মতোই— টেবিলে রাখা বই, দেয়ালের ঘড়ি, জানালার পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।

রাতুল উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে শহরটা জেগে উঠছিল, রিকশার টুংটাং শব্দ, দূরে কোথাও আজানের সুর, একটা কাক ডাকছিল বারবার। সব কিছু এত স্বাভাবিক লাগছিল যে রাতুল নিজেই সন্দেহ করতে লাগল— এটা কি সত্যিই একটা ভবিষ্যতের ঝলক ছিল, নাকি শুধু নিজের অপরাধবোধ আর অনুশোচনা থেকে তৈরি হওয়া একটা স্বপ্ন? দর্শনের কোনো ক্লাসে শোনা কথাগুলো কি নিজের অজান্তেই মনের গভীরে গিয়ে এই দৃশ্য বানিয়েছে? নাকি সত্যিই কোনো এক সমান্তরাল জগতে অন্য একটা রাতুল বাস করে, যে সেই সিদ্ধান্তটা অন্যরকম নিয়েছিল?

রাতুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখল অনেকক্ষণ, চোখের নিচের কালি, চুলের অগোছালো অবস্থা, ঠোঁটের কোণে জমে থাকা একটা অচেনা ক্লান্তি। এই মুখটা কি সত্যিই একদিন বদলে গিয়ে সেই বৃদ্ধ মানুষটার মুখ হবে, নাকি এটা শুধু একটা কল্পনা, যা কখনোই সত্যি হবে না, কারণ ঘটনাগুলো ইতিমধ্যে অন্যভাবে ঘটে গেছে? প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল, কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।

উত্তরটা রাতুল কখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে না। এবং অদ্ভুতভাবে, সেটা নিয়ে আর মাথা ঘামাল না।

কারণ প্রশ্নটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা হলো একটা উপলব্ধি, স্পষ্ট আর দৃঢ়, যা রাতুলের ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল সেই রাতের পর থেকে— আমরা কারো থাকার সময়টা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। শুধু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেই সময়টায় আমরা কতটা ভালোবাসি, কতটা মনোযোগ দিই, কতটা উপস্থিত থাকি।

অন্তরা তো আর নেই। এটা বদলানোর কোনো উপায় নেই, কোনো সময়রেখায়, কোনো সম্ভাবনায়। কিন্তু রাতুলের নিজের জীবনে, আরও মানুষ আছে, আরও সময় আছে, যেটা এখনো নষ্ট হয়নি।

সেই সকালেই রাতুল প্রথমবার বাবা-মাকে ফোন করল, শুধু কথা বলার জন্য, কোনো কারণ ছাড়াই। মা প্রথমে অবাক হলেন, তারপর গলার স্বরে খুশি ফুটে উঠল। রাতুল অনেকক্ষণ কথা বলল, ছোটবেলার গল্প শুনল, বাবার হাসির শব্দ শুনল ফোনের ওপাশ থেকে, এমন একটা শব্দ যেটা রাতুল বহুদিন শোনেনি।

এরপরের সপ্তাহগুলোয় রাতুল বদলাল না ঠিক, কিন্তু কিছু একটা যোগ হলো। ও এখনো দিকহীন, এখনো কোনো নির্দিষ্ট চাকরি নেই, এখনো রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে। কিন্তু এখন প্রতিটা মুহূর্তকে অন্যরকমভাবে দেখতে শুরু করল— এমনভাবে, যেন এটাই শেষ মুহূর্ত হতে পারে কারো সাথে, আর সেই ভাবনাটা ওকে ভয় পাওয়াল না, বরং প্রতিটা কথোপকথনকে, প্রতিটা হাসিকে আরও গভীরভাবে অনুভব করতে শেখাল।

পুরনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করল, বহুদিন পর। টিউশনির বাচ্চাদের সাথে আরও মন দিয়ে সময় কাটাতে লাগল, শুধু পড়ানো না, ওদের গল্প শোনা, ওদের ছোট ছোট আনন্দ-দুঃখের সাথী হওয়া। এমনকি অন্তরার কবরের কাছেও একদিন গেল, ফরহাদের অনুমতি নিয়ে, শুধু দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, মনে মনে বলল সেই কথাগুলো যেগুলো কখনো মুখে বলা হয়নি।

"আমি তোমাকে বাঁচাতে পারিনি," রাতুল ফিসফিস করে বলল, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, বাতাসে গাছের পাতা নড়ছিল। "কিন্তু আমি বুঝেছি, তোমাকে সত্যিই কী দরকার ছিল। শুধু ভালোবাসা। শুধু উপস্থিতি। আমি সেটা তোমাকে দিতে পারিনি সেই সময়, ভয়ের কারণে। কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করছি, বাকি জীবনে, যাকে ভালোবাসব, তাকে পুরোপুরি ভালোবাসব। যতদিন থাকে, ততদিন।"

বাতাস একটু জোরে বইল যেন, গাছের পাতা ঝরে পড়ল কয়েকটা, আর রাতুলের মনে হলো, বহুদূর থেকে কেউ যেন হালকা করে হাসল, একটা চেনা হাসি, লেকের পাড়ে প্রথম শোনা সেই জড়তামাখা হাসিটার মতো।

ফেরার পথে রাতুল হেঁটে গেল অন্তরার মায়ের বাসার দিকে, আজিমপুরের সেই পুরনো গলিতে, যেখানে বছর দুয়েক আগে একবার গিয়েছিল অন্য এক গল্পে, অন্য এক জীবনে। দরজা খুললেন এক ভদ্রমহিলা, চোখে গভীর ক্লান্তি, চুলে সাদা রেখা বেড়েছে অনেক। রাতুলকে চিনতে পারলেন না প্রথমে।

"আমি রাতুল। অন্তরার বন্ধু ছিলাম, অনেক আগে।"

ভদ্রমহিলার চোখে একটা ছায়া পড়ল, তারপর নরম হয়ে এলো। "ভেতরে এসো।"

চা খেতে খেতে ভদ্রমহিলা বললেন মেয়ের কথা, ছোটবেলার কথা, কীভাবে অন্তরা ছবি আঁকতে ভালোবাসত, কীভাবে বিয়ের পরও প্রতি শুক্রবার মায়ের সাথে দেখা করতে আসত, কীভাবে শেষ দিন সকালেও ফোন করে বলেছিল, "মা, বিকেলে আসব, তোমার জন্য মিষ্টি নিয়ে আসব।"

রাতুল চুপচাপ শুনল সব, মাঝে মাঝে মাথা নাড়ল, কিছু বলল না বেশি। শুধু যাওয়ার আগে বলল, "উনি একজন খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমার জীবনে অনেক বড় একটা প্রভাব রেখে গেছেন।"

ভদ্রমহিলা হাসলেন, চোখে পানি টলমল করছিল। "তুমি আবার এসো।"

রাতুল বাসা থেকে বেরিয়ে অনেকক্ষণ হাঁটল গলি ধরে, সন্ধ্যার আলো নিভে আসছিল আস্তে আস্তে, দোকানের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছিল। ও বুঝল, শোক কখনো পুরোপুরি যায় না, কিন্তু তার সাথে বাঁচতে শেখা যায়, ঠিক যেভাবে একদিন অন্তরাকে শিখিয়েছিল।

পথে যেতে যেতে একটা পুরনো মুদি দোকানের সামনে থমকে দাঁড়াল, যেখানে ছোটবেলায় ও নিজেও একবার এসেছিল, বাবার হাত ধরে। দোকানদার বদলে গেছে, দোকানের সাইনবোর্ড বদলে গেছে, কিন্তু জায়গাটার একটা চেনা গন্ধ রয়ে গেছে এখনো— পুরনো কাঠ আর মসলার মিশ্র গন্ধ। রাতুল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে, কিছু না কিনেই, শুধু সময়ের এই অদ্ভুত স্তরগুলোকে অনুভব করতে করতে— অতীত, বর্তমান, আর যা হতে পারত অথচ হয়নি, সব একসাথে মিশে আছে এই শহরের প্রতিটা ইটে, প্রতিটা গলিতে।

সাত

গল্পটা এখানে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জীবন কখনো ঠিক গল্পের মতো গোছানো হয় না।

বছরখানেক পর, রাতুল একটা বেসরকারি স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা শুরু করল, নিজের ইচ্ছেয়। প্রথমবারের মতো একটা কাজে স্থিতি খুঁজে পেল, কারণ কাজটার মধ্যে মানুষের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ ছিল, প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ, নতুন নতুন গল্প।

সেখানেই একদিন পরিচয় হলো আরেকজনের সাথে, শিক্ষকদের কক্ষে, চায়ের কাপ হাতে। মেয়েটার নাম নাফিসা, বিজ্ঞান পড়ায়, হাসিটা খুব চেনা লাগল না, কিন্তু চোখদুটোয় একটা সততা ছিল যেটা রাতুলকে টানল সহজেই।

নাফিসার সাথে প্রথম আলাপেই রাতুল বুঝল, এই মেয়েটা অন্তরার মতো না, আর সেটাই ভালো। অন্তরার জায়গায় কাউকে বসানোর কোনো ইচ্ছে ওর ছিল না, কারণ সেটা অসম্ভব, আর অন্যায়ও। নাফিসা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ, নিজের হাসির ধরন, নিজের রাগের কারণ, নিজের স্বপ্নগুলো নিয়ে। রাতুল সেই নতুনত্বকেই গ্রহণ করতে শিখল, তুলনা না করে।

একদিন স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে নাফিসা জিজ্ঞেস করল, "তুমি মাঝে মাঝে এমন দূরে চলে যাও, চোখের সামনে থেকেও। কী ভাবো তখন?"

রাতুল একটু ভাবল, তারপর প্রথমবারের মতো, সংক্ষেপে হলেও, সত্যি কথা বলল। "একজনের কথা মনে পড়ে, যাকে আমি ঠিকমতো ভালোবাসতে পারিনি। ভয় পেয়েছিলাম। এখন মনে হয়, ভয়ের চেয়ে বড় ক্ষতি বোধহয় আর কিছু নেই।"

নাফিসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর হাত বাড়িয়ে রাতুলের হাতের উপর হালকা করে রাখল, কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে। শুধু উপস্থিত রইল, ঠিক যেভাবে রাতুল একদিন অন্তরার পাশে উপস্থিত থাকত। রাতুল বুঝল, এই উপস্থিত থাকাটাই আসল জিনিস, যেটা ও নিজে শিখিয়েছিল অন্তরাকে, অথচ নিজে ভুলে গিয়েছিল একদিন, ভয়ের কাছে হেরে গিয়ে।

এবার রাতুল ভয় পেল না। জানত, ভবিষ্যতে কী হবে সেটা কেউ জানে না, কেউ নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। শুধু জানত, সামনে যে সময়টা আছে, সেটাকে পুরোপুরি বাঁচতে হবে।

পরদিন সকালে স্কুলে গিয়ে রাতুল দেখল, ক্লাসের একটা ছেলে, সবচেয়ে চুপচাপ, সবসময় একা বসে থাকা ছেলেটা, মন খারাপ করে বসে আছে বেঞ্চে। রাতুল কাছে গিয়ে পাশে বসল, কোনো প্রশ্ন করল না সাথে সাথে, শুধু চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। ছেলেটা একসময় নিজে থেকেই বলল, বাসায় ঝামেলা হয়েছে, বাবা-মায়ের ঝগড়া, রাতভর চিৎকার।

রাতুল মাথা নাড়ল, বুঝল। "কষ্ট হচ্ছে, তাই না?"

ছেলেটা মাথা নাড়ল, চোখে পানি চিকচিক করছিল।

"বোঝার দরকার নেই সব," রাতুল বলল, নরম গলায়, ঠিক যেভাবে একদিন অন্তরাকে বলেছিল, বহু বছর আগে, লেকের পাড়ে। "কিছু জিনিস বোঝার জন্য না, সহ্য করার জন্য। আর সহ্য করতে করতে একদিন দেখবে, হালকা লাগছে।"

ছেলেটা কিছু বলল না, শুধু একটু নড়ে এসে রাতুলের কাঁধের কাছাকাছি বসল, যেন সেই সান্নিধ্যটুকুই যথেষ্ট। রাতুল বুঝল, এই মুহূর্তটাই আসলে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা— যা একদিন অন্তরার কাছ থেকে শিখেছিল, আজ অন্য একজনকে দিচ্ছে, আর হয়তো এভাবেই একটা ভালোবাসা কখনো সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না, শুধু রূপ বদলায়, একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে বয়ে চলে, নদীর মতো, থামে না কোথাও।

বিকেলে বাসায় ফিরে রাতুল জানালার পাশে দাঁড়াল, বাইরের আকাশ দেখতে দেখতে। মনে পড়ল সেই ছেলেটার মুখ, মনে পড়ল অন্তরার মুখ, মনে পড়ল সেই ধূসর কুয়াশার জগত আর সেই বৃদ্ধ মানুষটার শেষ কথাগুলো। সব যেন একটা সুতোয় গাঁথা— ভালোবাসা কখনো নষ্ট হয় না, শুধু হাত বদলায়। রাতুল ঠিক করল, আজ রাতে নাফিসাকে ফোন করবে, শুধু কথা বলার জন্য, কোনো কারণ ছাড়াই।

সেই সন্ধ্যায়, নাফিসার সাথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল রাতুল। রাস্তার মোড়ে একটা পুরনো চায়ের দোকান, ঠিক সেরকম, যেখানে অন্তরার মৃত্যুর খবর পড়েছিল। মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর একটা চাপা ব্যথা অনুভব করল, কিন্তু এবার সেই ব্যথাটাকে এড়িয়ে গেল না, বরং সাথে নিয়ে এগিয়ে গেল।

"কী হলো?" নাফিসা জিজ্ঞেস করল, ওর মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে।

"কিছু না," রাতুল বলল, মৃদু হেসে। "পুরনো একটা কথা মনে পড়ল। একদিন বলব তোমাকে।"

রাতে বাসায় ফিরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাতুল আকাশের দিকে তাকাল। তারা ফুটে ছিল কয়েকটা, ঢাকার ধোঁয়াশা ভরা আকাশে যতটুকু দেখা যায়। ও ভাবল সেই ধূসর কুয়াশার জগতের কথা, সেই বৃদ্ধ মানুষটার কথা যে নিজেকে "সম্ভাবনা" বলেছিল। ভাবল, সেই সম্ভাবনাটা কি এখনো কোথাও অপেক্ষা করছে, নাকি চিরদিনের জন্য মুছে গেছে যেদিন থেকে রাতুল অন্য পথ বেছে নিয়েছে?

উত্তরটা জানা নেই। কিন্তু রাতুল আর সেই উত্তরের পেছনে ছোটে না। ও শুধু জানে, আগামীকাল সকালে আবার ক্লাস আছে, বাচ্চাদের হাসিমুখ দেখতে হবে, নাফিসার সাথে বিকেলে দেখা করার কথা আছে, মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে হবে, আর এই মুহূর্তগুলো, ছোট ছোট, সাধারণ, প্রতিদিনের মুহূর্তগুলোই, আসলে জীবনের আসল সম্পদ।

জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রাতুলের মনে হলো, এক মুহূর্তের জন্য, প্রতিবিম্বটা যেন সামান্য একটু দেরিতে নড়ল নিজের চেয়ে, যেন আরেকটা রাতুল, অন্য কোনো সময়রেখায়, একই মুহূর্তে একই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, নিজের মৃদুলার সাথে, নিজের অন্তরার সাথে, একটা ভিন্ন কিন্তু সমান বাস্তব জীবনে।

হয়তো এটা শুধু ক্লান্ত চোখের ভুল। হয়তো সত্যিই কিছু একটা।

রাতুল সেটা নিয়ে ভাবল না বেশিক্ষণ। শুধু পর্দাটা টেনে দিয়ে বিছানায় ফিরে গেল, ঘুমানোর জন্য, কালকের দিনটার জন্য প্রস্তুত হওয়ার জন্য। কারণ কালকের দিনটাই এখন ওর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস— না অতীত, যেটা বদলানো যায় না, না ভবিষ্যৎ, যেটা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, শুধু আজ, আর আগামীকাল, যেগুলো ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়া যায়।

(সমাপ্ত)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অনন্ত

* শুরু  কি করব কিছু বুজতে পারছি না। অনেক দিন ধরেই চিন্তা ভাবনা করছি কিছু করব করব কিন্তু কিছু করা হচ্ছে না। এইদিকে এক মাস ধরে বসে আছি নতুন কিছু করব করব ভেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে শামিমের ফোন এলো। কিরে যাবি নাকি ? কোথায় যাওয়ার প্লান? চলে আয় টংয়ের দোকানে । তাও ভাই ভালো । টাকা পয়সার এখন যা টানা টানি অবস্থা । বাসায় ও টাকা চাইতে লজ্জা করে । খুবই এক ভয়ানক অবস্থা।" তুই না কি প্রজেক্ট হতে নিবি বলছিলি। ঐটার কি হল। আরে বললেই কি সব হয় নাকি ? এইসব করতে ফান্ডিং এর প্রয়োজন হয় । আচ্ছা আচ্ছা তুই টং এর দোকানে আয় তারপর কথা হবে। আচ্ছা ঠিক আছে আসছি তুই ও আয়। সন্ধ্যার সময় বাহিরে ভালোই ঠান্ডা পরেছে । হুডিটা পরে বেরিয়ে গেলাম । রাস্তায় অনেক বাতাস বইছে । টং এর দোকানে শামীমের কোন কোন খোঁজ পাওয়া গেল না কিন্তু এতক্ষণ এ ওর চলে আসার কথা ছিল। এই দিকে শালা ফোনটা ও রিসিভ করছে না । ও কি আমার সাথে মজা করছে নাকি?  আমি পকেটে চা-বিড়ি খাওয়ার টাকাই নিয়ে এসেছি। ২ টা সিগারেট কিনে বাড়ি ফিরে যাওয়াই উত্তম কালকে ওর সাথে হিসেব বরাবর করব। টং এর দোকানের একটু সামনে যেতেই একটা বাশ-বাগান পরে। এর পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো পা কা...

নাম না দেয়া এক গল্প

১৫ আগস্ট শোক দিবসের কারনে আমার অফিস বন্ধ। প্রতিদিন সকাল ৬ টায় এলার্ম এর আওয়াজে ঘুম ভেংগে যায়। সরকারি বন্ধ থাকা সত্বেও আজকে তার ব্যতিক্রম হয়নি। আসলে ঘুম থেকে সকাল সকাল উঠার কোনো প্ল্যান ছিল না। গত রাতের একটা ভুলের জন্য আমার সকাল সকাল উঠতেই হলো। এলার্মটা মনে করে বন্ধ করি নি তাই। সারাদিন মাঠে ঘাটে ঘুরাঘুরির পরে বাসায় এসে রান্না করে খেতেও ভালো লাগে না। সোজা বিছানায় এসে ঘুমিয়ে পড়া তখন মনে হয় জীবনের সবথেকে বড় ফরজ কাজ। সেই ফাকে এলার্ম বন্ধ করতে ভুলে গেছি । আমার নাম রবিন । একটা এন জি ও তে কাজ করছি। রাঙ্গামাটিতে পোস্টিং হয়েছে। বয়স প্রায় ৩৪ ছুই ছুই । আপন বলতে মা আছেন আর ছোট একটা বোন আছে । বিয়ে হয়েছে ওর অনেক ভালো পরিবারে । আমার এখনো বিয়ে হয় নি আর ভবিষ্যৎ এ বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনা ও নেই। চাকরির সুবাদে সেখানে ঘুরে বেড়াই। সত্যি বলতে কি আমার এই একাকি জিবনটাকে আমি খুব উপভোগ করি।  সারাদিন ঘুমে কাটিয়ে বিকালে রাস্তায় বের হয়েছিলাম। তখনি আমার বসের ফোন। ইচ্ছে করেই ফোন রিসিভ করিনি। আজ ছুটির দিনে আবার কিসের কাজ। কাড়া লিকারের চা খেতে চলে গেলাম মঞ্জু ভাই এর দোকানে ।  “ভাই কড়া লিকারের এক কাপ রঙ...

ভয় পেয়েছেন ভাই?

       কোম্পানির কাজের জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহের শেষে রহিম সাহেবকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে যেতে হয় । এই সপ্তাহেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি । ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে কিছুটা পথ পার হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো । ব্যাপারটা যেন না বলে আসা মেহমানের মতো লাগলো রহিম সাহেবের । ছাতাটাও বোধ হয় ট্রেনে ফেলে এসেছেন । এ নিয়ে ছাতা হারানোর সংখ্যা  মনে হয় হাফ সেঞ্চুরি পার হবে । কিছুটা সামনে যেতেই একটা বন্ধ চায়ের দোকান চোখে পড়ল । মাথাটাকে কিছুটা হলেও এই বৃষ্টির হাত থেকে বাচাতে পারবেন এই ভেবেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো । টিনের তলায় কিছুক্ষন দাড়াতেই চল্লিশ  বছর বয়সী এক লোক এশে পাশে দাড়ালো ।  “কি হে মশাই এই এলাকায় নতুন নাকি” “জি ভাই কাজের সুবাদে এখানে আসা আরকি” কেন যে এই কথা বলতে গেলাম এই ভেবে জিভ কাটলাম । “ তো কোথায় ঊঠবেন ?’’ “ হাটহাজারী তে একটা হোটেল বুক করেছিলাম এই বৃষ্টির জন্য মনে হচ্ছে যেতে দেরি হয়ে যাবে । আপনি বুঝি এই এলাকার বাসিন্দা?’’ একটু আগ্রহ নিয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করলাম । “ আজ্ঞে সেই রকম না , আবার বলতে গেলে বাসিন্দাও । আমি এখানে ৬ মাস হয়েছি এসেছি।” “ ওহ আচ্ছা । তা এলাকাটা খুব শুনশান...

দেয়ালগুলো এখনো কথা বলে

প্রথম খণ্ড: ক্ষুধা ও শৈশব অধ্যায় ১: ভাতের ভূগোল ও অস্তিত্বের লড়াই ঢাকা শহরের তপ্ত পিচের ওপর যখন টিসিবির ট্রাকটি এসে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল একটি যান থাকে না; তা হয়ে ওঠে এই রাষ্ট্রে বেঁচে থাকার একমাত্র বাস্তব প্রতীক। জুলাই মাসের দুপুর। সূর্যটা মাথার ঠিক ওপরে। রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে। আরিফ যখন সেই দীর্ঘ লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়াল, তখন সে বুঝতে পারল অর্থনীতির ক্লাসে শেখা 'ডিমান্ড-সাপ্লাই' তত্ত্বটি কতটা নিষ্ঠুর। লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষ এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না, কারণ ক্ষুধার কোনো আভিজাত্য নেই। সামনে একজন বৃদ্ধ, পেছনে একজন গর্ভবতী নারী। আরিফের হাতে একটি পলিথিনের ব্যাগ আর পকেটে তিনশ টাকা। চালের দাম কেজিতে পঁয়ষট্টি টাকা, কিন্তু টিসিবিতে পঞ্চাশ। এই পনেরো টাকার ব্যবধানটাই আরিফের সপ্তাহের বাজার নির্ধারণ করে দেবে। লাইনটা এগোচ্ছে ধীরে। প্রতি পাঁচ মিনিটে তিন ফুট। আরিফ হিসাব করল, তার পালা আসতে আরও ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। পাশের চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে টকশোর আওয়াজ। "দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে... রিজার্ভ বাড়ছে... রপ্তানি আ...

মৃত্যুর তারিখ

 * শুরু আজকে ব্যাংক এ গিয়ে বসতেই এক ভদ্রলোকের দেখা মিলল। বয়স ৫০-৫৫ এর মতো হবে।সে নাকি তার জমানো সব টাকা তুলে নিতে চায়।আজব ব্যাপার এত সকালে এই রকম আগে কখনো দেখি নি । হয় তো ইমারজেন্সী কেস। তাই কৌতূহল বসতই জিজ্ঞেস করে ফেললাম -কোন বিশেষ প্রয়োজন নাকি? এতগুলো টাকা একবারে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন যে -হ্যা মানে আমি আর বেশিদিন বাঁচবো নাতো তাই টাকাগুলো তুলে নিয়ে যাচ্ছি। -আজব ব্যাপার আপনি কিভাবে জানলেন আর বাঁচবেন না। এইসব তো উপর আলার হাতে।ব্যাপারটা কি ? খুলে বলুন তো -আমার জীবন রেখা বলছে আগামী ২৩ তারিখ আমি মারা যাবো তাই এই আয়োজন। -এই ২৩ তারিখ মনে হতে ২ দিন সময় আছে এইবার আমার তাকে বদ্ধ উন্মাদ বলেই মনে হলো।কিন্তু এই উন্মাদের একাউন্টে ১০লাখ টাকা কে জমিয়ে রাখবে। -এত সিউর হচ্ছেন কিভাবে যে ২ দিন পর ই আপনি মারা যাবেন? এইটা সত্যি নাও ত হতে পারে। নাকি ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোর অঝুহাত। -অজুহাত হতে যাবে কেন ? আমার টাকা আমি যেকোন সময় ই তুলতে পারব। আই হ্যাভ দা রাইট। -হ্যা আর এই কথা না বাড়িয়ে টাকা গুলো তার হতে বুজিয়ে একাউন্ট ক্লোজ করে দিলাম। -আচ্ছা আপনার কথাগুলো কি সত্যি ? -হ্যা ।কেন বিশ্বাস হয় না? আপনি ...

একা থাকার কিছু অভিজ্ঞতা

         ১ম পর্ব            একা থাকার মধ্যে এক রকম আনন্দ কাজ করে । এই ২ মাস যাবত একা আছি । বাসা থেকে ভার্সিটি একাই যাওয়া আসা করছি । অনেকে বলে একা একা থাকার মধ্যে একঘুয়েমি ভাব কাজ করে আমার ক্ষেত্রে তার ছিটে ফোটাও অনুভব করিনি । আমার ভার্সিটি ওপেন ক্রেডিট সিস্টেম হওয়ায় সেম সেমিস্টার এর ছেলে মেয়ে পাওয়া এক রকম দুষ্কর ব্যাপার। তাই থাকতে হয় একা একাই। একজন বাচাল টাইপ মানুষের ক্ষেত্রে এইরকম পরিবেশে থাকা অনেকটাই চ্যলেঞ্জিং ব্যপার। স্কুল কলেজে থাকতে প্রচুর বন্ধু ছিল । লাইফে কোন সময় বোরিংনেস ফিল হয় নি । ভার্সিটি লাইফে এসে এই বন্ধু বানানোই আমার জন্য কস্টকর হয়ে গিয়েছে। একা একা বাসে ভ্রমন আর বন্ধুর সাথে বাসে ভ্রমন এই ২ জিনিস নিয়ে দুই অভিজ্ঞিতা হয়েছে । আহে কলেজ যাওয়ার সময় বাসে খুব আড্ডা চলতো   আশেপাশে কি হচ্ছে তার দিকে বিন্ধুমাত্র খেয়াল যেত না । একা চালাফেরা করার সময় মস্তিস্ক দেখি সবসময় খোজা খুজী করে কোথেয় কি হচ্ছে । যেমন ধরুন এই মাত্র বাসে এক ভুরি আলা কাকা উঠে গেল। কেন এই ভিড়ের মাঝে তিনি উঠলেন । ফাকা একটা বাসেই তো তিনি উঠতে পারতেন। আবার নিজেই...